সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ‘কাগজে-কলমে’

নাম-পরিচয় সঙ্কটে আমানত সংগ্রহ অনিশ্চয়তায় কর্মকর্তা ও গ্রাহক

হাওয়ার ওপর’ চলছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম। কাগজে-কলমে একীভূত হওয়ার ঘোষণা থাকলেও এখনো রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) থেকে ব্যাংকগুলোর শেয়ার কাঠামো আলাদা করা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পড়েছেন অদ্ভুত এক প্রশাসনিক ও কার্যকর সঙ্কটে। তারা বুঝতে পারছেন না, গ্রাহকদের কাছ থেকে নতুন আমানত কোন নামে গ্রহণ করবেন। ফলে শাখাপর্যায়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা। একইসাথে ব্যাংকগুলোর গ্রাহক ও আমানতকারীদের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition
  • শেয়ার আলাদা হয়নি আরজেএসসি থেকে
  • এমডি নিয়োগও ঝুলে আছে
  • ৫ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও আমানতকারীদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ

দেশের ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবতায় এখনো পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। ফলে কার্যত ‘হাওয়ার ওপর’ চলছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম। কাগজে-কলমে একীভূত হওয়ার ঘোষণা থাকলেও এখনো রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) থেকে ব্যাংকগুলোর শেয়ার কাঠামো আলাদা করা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পড়েছেন অদ্ভুত এক প্রশাসনিক ও কার্যকর সঙ্কটে। তারা বুঝতে পারছেন না, গ্রাহকদের কাছ থেকে নতুন আমানত কোন নামে গ্রহণ করবেন। ফলে শাখাপর্যায়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা। একইসাথে ব্যাংকগুলোর গ্রাহক ও আমানতকারীদের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ।

৫ ব্যাংকের একীভূতকরণ পরিকল্পনা

ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক- এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। নীতিগতভাবে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হলেও বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো এখনো শেষ হয়নি। বিশেষ করে আরজেএসসি থেকে শেয়ার পুনর্গঠন এবং আইনগত কাঠামো নির্ধারণের বিষয়টি ঝুলে আছে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনি কাঠামো স্পষ্ট না হলে নতুন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু করা সম্ভব নয়। অথচ মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে পুরনো নাম ও কাঠামোর ওপর নির্ভর করে।

আমানত গ্রহণে নাম সঙ্কট

এই অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শাখাপর্যায়ে। কর্মকর্তারা জানেন না, গ্রাহকদের নতুন হিসাব কোন নামে খোলা হবে। এক্সিম ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের বলা হচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অংশ হিসেবে কাজ করতে। কিন্তু আরজেএসসি থেকে এখনো শেয়ার বা নিবন্ধন পরিবর্তন হয়নি। ফলে নতুন হিসাব খোলার সময় আমরা কোন নাম ব্যবহার করব, সেটাই স্পষ্ট নয়।’ একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। তাদের মতে, গ্রাহকরা নতুন আমানত রাখতে এলে অনেক সময় তারা প্রশ্ন করেন, ব্যাংকটি এখন কোন নামে চলছে। কিন্তু কর্মকর্তাদের কাছে এর স্পষ্ট উত্তর নেই। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের এক শাখা ব্যবস্থাপক বলেন, ‘উপর থেকে আমানত সংগ্রহের চাপ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু গ্রাহকদের কাছে যখন ব্যাংকের নাম নিয়েই পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে পারছি না, তখন তাদের আস্থা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।’

আমানত সংগ্রহে বাড়তি চাপ

ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, প্রশাসনিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিকই দেয়া হচ্ছে। শাখাগুলোকে আগের মতোই আমানত বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ব্যাংকের কাঠামো ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক গ্রাহকই নতুন আমানত রাখতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তারা একদিকে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ, অন্যদিকে গ্রাহকদের প্রশ্ন, দুই দিক থেকেই চাপে রয়েছেন। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রাহকরা এখন খুব সচেতন। তারা জানতে চান ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কী। কিন্তু আমরা নিজেরাই জানি না সামনে কী হবে।’

এমডি নিয়োগও ঝুলে আছে

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ব্যাংক খাতের নিয়ম অনুযায়ী, একীভূত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দ্রুত নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো গঠন করা জরুরি। কিন্তু এমডি নিয়োগ না হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেতৃত্বের স্পষ্টতা না থাকলে কর্মীদের মধ্যেও আস্থাহীনতা তৈরি হয়। বর্তমানে সেই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘একটি ব্যাংক পরিচালনার জন্য শক্ত নেতৃত্ব প্রয়োজন। কিন্তু আমরা এখনো জানি না আমাদের এমডি কে হবেন, বা ব্যবস্থাপনা কাঠামো কেমন হবে।’

গ্রাহকদের মধ্যেও উদ্বেগ

ব্যাংকগুলোর এই অনিশ্চয়তা গ্রাহকদের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে। অনেক আমানতকারী জানতে চাইছেন, তাদের জমা রাখা অর্থের ভবিষ্যৎ কী হবে। বিশেষ করে যেসব গ্রাহকের বড় অঙ্কের আমানত রয়েছে, তারা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। কেউ কেউ নতুন আমানত রাখা থেকে বিরত থাকছেন। এক আমানতকারী বলেন, ‘যদি ব্যাংকের নাম বা কাঠামোই ঠিক না থাকে, তাহলে আমরা কিভাবে নতুন করে টাকা রাখব?’ তবে ব্যাংক কর্মকর্তারা গ্রাহকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন যে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ব্যাংক আরো শক্তিশালী হবে।

আইনি জটিলতার প্রভাব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক একীভূতকরণ একটি জটিল প্রক্রিয়া। এতে আর্থিক, প্রশাসনিক ও আইনি- সব ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন। আরজেএসসি থেকে শেয়ার কাঠামো পুনর্গঠন না হলে নতুন প্রতিষ্ঠানের আইনি পরিচয় স্পষ্ট হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা দেখা দেয়। একজন ব্যাংক বিশ্লেষক বলেন, ‘একীভূতকরণ সফল করতে হলে প্রথমেই আইনি কাঠামো স্পষ্ট করতে হবে। না হলে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, যা ব্যাংকের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর।’

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। তাদের আশঙ্কা- প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হলে গ্রাহকদের আস্থা আরো কমে যেতে পারে। এ ছাড়া কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও অনেকে উদ্বিগ্ন। একীভূত হওয়ার পর কতগুলো শাখা থাকবে, কতজন কর্মী প্রয়োজন হবে, এসব প্রশ্নেরও এখনো পরিষ্কার উত্তর নেই। এক কর্মকর্তা বলেন ‘আমরা চাই দ্রুত সিদ্ধান্ত হোক। অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি সমস্যা তৈরি হবে।’

দ্রুত সমাধানের দাবি

ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি। বিশেষ করে আরজেএসসি থেকে শেয়ার পুনর্গঠন, নতুন ব্যাংকের নিবন্ধন এবং ব্যবস্থাপনা কাঠামো নির্ধারণ- এই তিনটি বিষয় দ্রুত চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ধাপ সম্পন্ন হলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কার্যকরভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে এবং গ্রাহকদের আস্থাও ফিরে আসবে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে শক্তিশালী একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা ছিল ব্যাংক খাত সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতি সেই উদ্যোগকেই এখন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আরজেএসসি থেকে শেয়ার আলাদা না হওয়া, ব্যাংকের নাম নিয়ে বিভ্রান্তি, শাখা পর্যায়ে আমানত সংগ্রহের সঙ্কট এবং এমডি নিয়োগ ঝুলে থাকা- সব মিলিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যেই পথচলা শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে একীভূত ব্যাংকের কার্যক্রম স্পষ্ট করা না হলে কর্মকর্তা, গ্রাহক ও আমানতকারীদের উদ্বেগ আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।