জনমতের যুদ্ধে বদলে যাচ্ছে রাজনীতির রূপ

ফেসবুক থেকে ফ্রন্টলাইন

হারুন ইসলাম
Printed Edition

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আগে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান ভরসা ছিল জনসভা, মিছিল, পোস্টার বা প্রচলিত গণমাধ্যম; কিন্তু এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দেয়া, জনমত তৈরি করা, এমনকি আন্দোলন সংঘটনের ক্ষেত্রেও সামাজিক মাধ্যম বড় ভূমিকা রেখে চলেছে।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রভাব আরো সামনে আসছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এর পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সংস্কার, নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে বড় অংশের আলোচনা চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান মঞ্চ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যম এখন শুধু তথ্য আদান-প্রদানের জায়গা নয়; বরং এটি একটি প্রভাব বিস্তারের শক্তিশালী মাধ্যম। আগে মানুষ সংবাদমাধ্যম থেকে তথ্য নিয়ে মতামত তৈরি করত, এখন মানুষ নিজেরাই তথ্য তৈরি করছে, শেয়ার করছে এবং অন্যকে প্রভাবিত করছে। এতে জনমত গঠনের প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন এসেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রওনক জাহান বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন একটি বড় শক্তি। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। এখন একটি ভাইরাল পোস্ট অনেকসময় একটি জনসভার চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে।

এক জরিপে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে সক্রিয় সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ মিলিয়ন (ছয় কোটি), যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪.৩ শতাংশ। এর মধ্যে ফেসবুকের ব্যবহারকারী সবচেয়ে বেশি, যা ২০২৪ সালের আগস্টের তথ্য অনুযায়ী সাত কোটি ৩৩ লাখের বেশি। বাংলাদেশে সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৬৫-৬৮% পুরুষ এবং ৩৪-৩৬% নারী। বর্তমানে দেশের এই কয়েক কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, যার বড় অংশই তরুণ। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের লক্ষ্য করে নতুন কৌশল নির্ধারণ করছে। সংক্ষিপ্ত ভিডিও, লাইভ অনুষ্ঠান, গ্রাফিক্স ও মিম- এসবের মাধ্যমে তারা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছে। এতে প্রচারণার ধরন আগের চেয়ে ঢের বেশি ।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। বিভিন্ন ছবি, ভিডিও, লাইভ সম্প্রচার এবং হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একসাথে যুক্ত হতে পেরেছিল এবং আন্দোলন শক্তিশালী হয়। তবে সামাজিক মাধ্যমের এই বিস্তারের সাথে সাথে উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষ করে ভুয়া তথ্য, গুজব ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনেকসময় ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেয়া হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমও একটি বড় ভূমিকা রাখছে। এই অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্ট দেখায়। ফলে মানুষ অনেকসময় একধরনের তথ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে ভিন্ন মতের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং সমাজে বিভাজন বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এক দিকে ভুয়া তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্য দিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে। এই ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ নয়।

এই প্রেক্ষাপটে ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া এখন গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারক এবং নাগরিক সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা শুধু সাংবাদিকতার দায়িত্ব নয়, এটি এখন গণতন্ত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য একটি উপাদান।

ফ্যাক্ট-চেকিং উদ্যোগ নিয়ে কাজ করা সংগঠন দ্য ডিসেন্টের প্রধান সম্পাদক কদরুদ্দিন শিশির বলেন, বাংলাদেশে ভুয়া তথ্যের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ছড়ায়। অনেকসময় পুরনো ছবি বা ভিডিও নতুন ঘটনার সাথে যুক্ত করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়। আমাদের কাজ হচ্ছে এসব তথ্য যাচাই করে সত্যতা তুলে ধরা।

তিনি জানান, ফ্যাক্ট-চেকিং শুধু ভুল তথ্য শনাক্ত করে না; বরং মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতেও ভূমিকা রাখে।

গবেষক ও মিডিয়া বিশ্লেষক সামিয়া রহমান মনে করেন, ফ্যাক্ট-চেকিং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বাচন, নীতিনির্ধারণ বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভুল তথ্য ছড়ালে তা জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে।

তিনি বলেন, সরকার, গণমাধ্যম এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে একটি শক্তিশালী তথ্য যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুয়া তথ্য শনাক্ত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের রাজনীতি আরো বেশি ডিজিটাল হয়ে উঠবে। নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণ সবকিছুতেই সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা বাড়বে। ফলে যারা এই মাধ্যমকে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারবে, তারাই রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, সামাজিক মাধ্যম তরুণদের রাজনীতিতে আগ্রহী করে তুলেছে। তারা এখন সরাসরি মতামত দিচ্ছে। এটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক, তবে এই মতামত যেন সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ডিজিটাল যুগে রাজনীতি আরো দ্রুতগতির হয়ে উঠেছে। একটি ঘটনা ঘটার সাথে সাথে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও প্রভাব পড়ে।

তবে সবকিছুর পরও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক মাধ্যমকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি যেমন বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, তেমনি মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগও বাড়িয়েছে। আগে যেখানে সাধারণ মানুষের কথা শোনা যেত না, এখন তারা সরাসরি নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারছে।

বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এটি যেমন জনমত গঠনের নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করছে।