এস এম মিন্টু সুন্দরবন থেকে
ভারত তাদের দেশের যে সব নাগরিককে বাংলাদেশে পুশব্যাক করেছে তাদেরকে ভবিষ্যতে পুশব্যাক করা হবে কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, অবৈধভাবে ভারতীয় যারা বাংলাদেশে আছে তাদেরকে আমরা পুশব্যাক করবো না, প্রোপার চ্যানেলেই ফেরত পাঠানো হবে। অবৈধভাবে পাঠানো তো আইনত সিদ্ধ নয়। তিনি বলেন, আমার দেশের নাগরিক হলেও পুশব্যাক করার কোনো অধিকার ভারতের নেই।
গতকাল শনিবার সকালে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর সুন্দরবনে বিজিবির যশোর রিজিয়নের আওতাধীন রিভারাইন বর্ডার গার্ড (আরবিজি) কোম্পানির দায়িত্বপূর্ণ জল সীমান্তের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিতে ‘বয়েসিং ভাসমান বিওপি’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সুন্দরবনের জলসীমাসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনেক মানুষকে পুশব্যাক করেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ভারত মান্দারবাড়িয়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে পুশব্যাক করেছিল সেখানে আমি পরিদর্শন করেছি। ভারতকে আমরা জানিয়েছি- আমাদের কোনো বাংলাদেশী যদি তাদের (ভারতে) ওখানে থেকে থাকে তাহলে প্রোপার চ্যানেলে পাঠান। যেমন ভারতের যারা বাংলাদেশে আছে তাদের আমরা প্রোপার চ্যানেলে পাঠিয়ে থাকি। আমরা কাউকে পুশব্যাক করি না।
তিনি আরো বলেন, গতকাল আপনারা দেখেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে ভারত পুশব্যাকের চেষ্টা করেছিল কিন্তু বিজিবির সাথে, আনসার এবং স্থানীয় জনগণের সহায়তায় ভারতের পুশব্যাক চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। আপনারা সবাই যদি সহযোগিতা করেন তাহলে ভারত পুশব্যাক করতে পারবে না। বিজিবির সাথে জনগণ এবং সাংবাদিক ভাই-বোনদেরও সহযোগিতা দরকার।
পুশব্যাক ঠেকাতে প্রতিবাদমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ইতোমধ্যে ডিপ্লোমেটিক সল্যুশননের (কূটনীতিক সমাধান) চিঠি লেখা হয়েছে। কূটনীতিক সমাধানের জন্য এ বিষয়ে আমাদের অ্যাম্বাসাডর, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের সাথেও কথা হয়েছে।
আমাদের বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে কি? এমন প্রশ্নের জবাবে লে. জে. (অব:) জাহাঙ্গীর বলেন, আমার কাছে এটা (পুশব্যাক) ওরকম উসকানি মনে হচ্ছে না। যেহেতু এর আগেও উনারা (ভারত) পুশব্যাক করেছিল অনেক আগে; যে সময় পুশব্যাক করেছিল সে সময় আমি বিজিবির ডিজি ছিলাম। সেটা অবশ্য অনেক বছর আগে করেছিল।
কিন্তু হঠাৎ এ সময় কেন আবার পুশব্যাক? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, কিছুদিন আগে শুনছেন গুজরাটে বাঙালি কলোনির মতো ছিল (বাঙালি বস্তি)। গুজরাটে সেটা ভেঙে দেওয়ার পরেই এটা (পুশব্যাক) শুরু হয়েছে। ইউএনএসিআরের কার্ড হোল্ডারদেও পুশব্যাক করা হয়েছে কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমরা অলরেডি প্রোটেশ পাঠিয়েছি। এর ভেতর কিছু রোহিঙ্গা চলে আসে। যেসব রোহিঙ্গা আমাদের দেশে ছিল তাদেরও পাঠিয়েছে আবার ভারতীয় রোহিঙ্গাদেরও পাঠিয়ে দিচ্ছে। এজন্য আমরা এটার প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে।
বাংলাদেশে অবৈধ ভারতীয় আছে কি না যাদের পুশব্যাক করা হবে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে অবৈধ ভারতীয় একেবারেই নাই আমি বলবো না, আপনাদের অনুরোধ করবো যদি থাকে জানান আমরাও যেন প্রোপারওয়েতে (নিয়ম মাফিক) পাঠাতে পারি।
সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সহায়তা করবে বয়েসিং ভাসমান বিওপি
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব:) দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবনসংলগ্ন জল সীমান্তের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে ‘বয়েসিং ভাসমান বিওপি’ উদ্বোধন করেছেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা গতকাল শনিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে বিজিবির রিভারাইন বর্ডার গার্ড (আরবিজি) কোম্পানির দায়িত্বপূর্ণ সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন বাংলাদেশ-ভারত জল সীমান্তবর্তী রায়মঙ্গল নদী ও বয়েসিং খালের মুখে ‘বয়েসিং ভাসমান বিওপি’ উদ্বোধন করেন।
এ সময় বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল জিয়াউল হাসান, বিজিবি যশোর রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ হুমায়ন কবির, খুলনা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো: মেহদী হাসান চৌধুরী, নীলডুমুরস্থ বিজিবি ১৭ ব্যটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো: শাহরিয়ার রাজীব, উপঅধিনায়ক মেজর সুশমিত প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
ভাসমান বিওপি উদ্বোধন শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সীমান্তবর্তী রায়মঙ্গল নদী ও বয়েসিং খালের সংযোগস্থলে বিজিবির ‘বয়েসিং ভাসমান বিওপি’-এর শুভ উদ্বোধন করা হলো। সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে এ ভাসমান বিওপিটি একটি পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে, যা জলপথে টহল ও নজরদারির সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত হলেও সুন্দরবনের বিস্তৃৃত জলাভূমি ও নদীবেষ্টিত সীমান্ত এলাকায় স্থলপথে নিয়মিত টহল প্রদান অনেকটাই কঠিন। এ ভাসমান বিওপি চোরাচালান, মানবপাচার, বনজসম্পদ লুণ্ঠন এবং অন্যান্য সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর প্রতিক্রিয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ-ভারত ৪,১৫৬ কিমি সীমান্তের মধ্যে ১৮০ কিলোমিটার নদীমাতৃক, যার মধ্যে প্রায় ৭৯ কিলোমিটার এলাকা সুন্দরবনের অন্তর্গত। পূর্বেও দু’টি ভাসমান বিওপি একটি কাঁচিকাটায় অপর আরেকটি আঠারোবেকিতে স্থাপন করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় বয়েসিং-এ তৃতীয় ভাসমান বিওপিটি চালু হলো।
প্রধান অতিথি বলেন, সীমান্তে কার্যকর জলভিত্তিক নজরদারি নিশ্চিত করতে বিজিবির অধীনে একটি বিশেষ ‘রিভারাইন বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন গঠনের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যা ভবিষ্যতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। সরকার মনে করে, ‘বয়েসিং ভাসমান বিওপি’ শুধুমাত্র একটি স্থাপনা নয় এটি একটি কৌশলগত নিরাপত্তা উদ্যোগ, যা সীমান্ত এলাকায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতিরবাস্তব রূপ। এটি দেশের সীমান্তে ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক ও কার্যকর নিরাপত্তা সংস্কৃতি গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
ভাসমান বিওপি সম্পর্কে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, বিজিবির একটি রিভারাইন বর্ডার গার্ড কোম্পানি আছে, যেটা মূলত সুন্দরবন এলাকায় পাহারা দেওয়া, টহল করা, চোরাচালান প্রতিরোধ করা, যেকোনো ধরনের অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে কাজ করছে। এ কোম্পানির অধীনে কৈখালিতে ১টি স্থল বিওপি এবং কাঁচিকাটা ও আঠারভেকিতে দুইটি ভাসমান বিওপি আছে। সুন্দরবনের রায়মঙ্গল নদী ও বয়েসিং চ্যানেলে দিয়ে চোরাচালানের বেশ বড় একটা চক্র সক্রিয় ছিল। এটা প্রতিরোধ করার জন্য বয়েসিং খালের মুখে আরো ১টি ভাসমান বিওপি স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আজ এ বিওপিটি উদ্বোধনের মাধ্যমে ভাসমান বিওপি তার কার্যক্রম শুরু করলো। এ বিওপির মাধ্যমে সুন্দরবনে চোরাচালান প্রতিরোধসহ সবধরনের অপরাধ দমন আরো সুন্দর ও সহজতর হবে বলে আশা রাখি।
সাম্প্রতিককালে সীমান্ত দিয়ে পুশইনের ব্যাপারে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, মূলত সিলেটের বিয়ানীবাজার, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রামের রৌমারীর প্রত্যন্ত চর এলাকা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জনবসতিহীন এলাকা দিয়ে পুশইনের ঘটনা ঘটেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে প্রতিনিয়তই নিয়মবহির্ভূতভাবে পুশইনের ঘটনা ঘটছে, আজকে সকালেও কিছু পুশইন হয়েছে। আমাদের সীমান্তটা এত বিস্তৃত যে প্রতিটি জায়গায় গার্ড করা সম্ভব না। তারপরেও বিজিবি সদস্যরা যথাসাধ্য প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী সাধারণ জনগণ, আনসার ও পুলিশ সদস্যরাও পুশইন রোধে বিজিবিকে সহায়তা করছে। আমরা বলেছি, যদি কোনো বাংলাদেশী নাগরিক ভারতে থেকে থাকে তবে নিয়মমাফিকভাবে হস্তান্তর গ্রহণের মাধ্যমে ফেরত প্রদান করা হয়। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চিঠি লেখা হয়েছে। বিজিবির পক্ষ থেকেও সার্বিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি। ফ্ল্যাগ মিটিং ও প্রতিবাদলিপি প্রেরণ করেছি। সীমান্তে বিজিবির নিরাপত্তা জোরদার, টহল তৎপরতা ও জনবল বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী জনসাধারণকে সচেতন করার পাশাপাশি বিজিবিকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার জন্য বলা হয়েছে।
ভাসমান বিওপি উদ্বোধন শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাতক্ষীরার শ্যামনগরস্থ বিজিবি ১৭ ব্যাটালিয়নের সদর দফতর পরিদর্শন করেন। তিনি সেখানে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং কর্মরত বিজিবি সদস্যদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।



