নারী কনস্টেবলের ফাঁদে নিঃস্ব একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition
নারী কনস্টেবলের ফাঁদে নিঃস্ব একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা
নারী কনস্টেবলের ফাঁদে নিঃস্ব একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা

পুলিশ বিভাগে শৃঙ্খলা ও সেবা প্রদানের অঙ্গীকার থাকলেও, রাজারবাগ যানবাহন শাখায় কর্মরত নারী কনস্টেবল সাবরিনা মমতাজের বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। পুলিশে চাকরির সুযোগ এবং নারী নির্যাতন আইনের অপব্যবহার করে তিনি নিয়মিত ‘বিয়ে বাণিজ্য’ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে এক ভয়াবহ অপরাধচক্র গড়ে তুলেছেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তার একাধিক বিয়ে, অর্থ আত্মসাৎ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে সহকর্মীদের হয়রানির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

সবশেষ ভুক্তভোগী হিসেবে পুলিশ পরিদর্শক এ কে এম মনিরুল আলম আইজিপি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবরিনা নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে গত বছরের ২২ মার্চ মনিরুলের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর মনিরুল জানতে পারেন সাবরিনা এর আগেও দু’টি বিয়ে করেছিলেন এবং তার একাধিক অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের কারণে মনিরুল তাকে ডিভোর্স দিলে শুরু হয় সাবরিনার আসল খেলা। তিনি বিবাহিত জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে মনিরুলকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন। মান-সম্মানের ভয়ে মনিরুল পুনরায় তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হলে সাবরিনা ২০ লাখ টাকা এবং একটি ফ্ল্যাট দাবি করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় চিকিৎসার অজুহাতে আরো প্রায় আট লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। অতিষ্ঠ হয়ে মনিরুল তাকে দ্বিতীয়বার ডিভোর্স দিলে সাবরিনা পাল্টা বিভাগীয় অভিযোগ করেন, যার ফলে বর্তমানে মনিরুল আলম সাময়িকভাবে বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনি অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় তার অতীত গোপন করে নতুন শিকারে নামেন। দিনাজপুর জেলায় কর্মরত থাকাকালীন তিনি প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করেন। প্রকৃতপক্ষে তার প্রথম স্বামী মাহফুজুর রহমান, যার বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল থানার কালিগাঁও গ্রামে। বিয়ের কয়েকমাস পরেই বিচ্ছেদ ঘটিয়ে তিনি পরবর্তী শিকারের সন্ধানে নামেন। প্রথম বিয়ের তথ্য লুকিয়ে তিনি নীলফামারীর সৈয়দপুরের ধলগাছ গ্রামের মমিনুল ইসলাম সাগরকে বিয়ে করেন। সৈয়দপুর থানায় কর্মরত থাকাকালীন এই সম্পর্কটিও তিনি বেশিদিন স্থায়ী হতে দেননি।

তা ছাড়া নীলফামারীর ডোমার থানার কনস্টেবল জাহাঙ্গীর আলমকে ফেসবুকে কুপ্রস্তাব দেয়ার অভিযোগে জাহাঙ্গীর একটি লিখিত অভিযোগ দিলে তাকে পঞ্চগড়ে এবং সাবরিনাকে লালমনিরহাটে বদলি করা হয়। এরপর তিনি ইন্সপেক্টর আবু নাসের রায়হানের সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান এবং বিয়ে করতে ব্যর্থ হয়ে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।

নীলফামারী দায়রা জজ আদালতে সাবরিনা ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০ সালে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থানায় তিনি একটি শ্লীলতাহানির মামলা করেন, যা স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা হিসেবে পরিচিতি পায়। এ ছাড়া নীলফামারী আদালতে দায়েরকৃত একটি মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন তিনি। মামলার প্রধান সাক্ষী কুবায়েদ ফেরদৌসর জবানবন্দীতে ২০ লাখ টাকা দাবির কথা বললেও জেরায় স্বীকার করেন যে, কোনো ঘটনা ঘটেনি, ভুল বোঝাবুঝি থেকে মামলা হয়েছে। এমনকি আসামিরা খালাস পেলে তার কোনো আপত্তি নেই বলেও তিনি জানান। ২ নং সাক্ষী সেলিম রেজা সরাসরি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আদালতে কোনো জখম বা ইনজুরি রিপোর্ট উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ফলে আদালত সাবরিনার সাজানো গল্পকে প্রত্যাখ্যান করে আসামিদের খালাস প্রদান করেন।

অনুসন্ধানে সাবরিনা নিজেকে একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে সহকর্মীদের হুমকি প্রদান করেন। ডিএমপিতে কর্মরত ঠাকুরগাঁও এলাকার একজন প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা সাবরিনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে রক্ষা করছেন। অভিযুক্তের বাড়ি এবং ওই কর্মকর্তার বাড়ি একই জেলায় হওয়ায় তিনি সব বিভাগীয় ব্যবস্থা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

বর্তমানে সাবরিনা মমতাজ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে হয়রানি এবং মনিরুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা এখন তাদের চাকরি ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কিত। খিলগাঁও থানায় মনিরুল আলমের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি, তবে আইনি ভিত্তি না থাকায় তা সম্ভব হয়নি।

পুলিশের মতো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে থেকে একজন নারী কনস্টেবলের এমন বেপরোয়া ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড বাহিনীর ভাবমূর্তিকে ক্ষুণœ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভুক্তভোগীদের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই ‘বিয়ে বাণিজ্যের’ মূল হোতা সাবরিনা মমতাজের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

সংশ্লিষ্টরা জানান, যেখানে সাবরিনার বিরুদ্ধে একাধিক বিয়ে ও অর্থ আত্মসাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে, সেখানে ভুক্তভোগী মনিরুল আলমকেই দায়িত্ব হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অথচ সাবরিনার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নামে কেবল কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। পুলিশের পোশাক ব্যবহার করে সহকর্মীদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করার এই স্পর্ধা বাহিনীর চেইন অফ কমান্ডকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

এই বিষয়ে জানতে কনস্টেবল সাবরিনা মমতাজের সাথে একাধিকবার যোগযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি কল রিসিভ করেনি।