সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশের ব্যবসায়ী সমাজের দৃষ্টি এখন রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি অর্থনৈতিক নীতির দিকে। বিনিয়োগ, কর কাঠামো, ব্যাংক ঋণ, আমদানি-রফতানি বিধিমালা, ডলার বাজার এবং সবচেয়ে বেশি- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা- এসব প্রশ্নেই নির্ধারিত হবে আগামী কয়েক বছরের ব্যবসা পরিবেশ।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক পালাবদল স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া; কিন্তু নীতিগত অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হলে বিনিয়োগ থেমে যায়, উৎপাদন কমে এবং বাজারে আস্থার ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে নতুন সরকারের প্রথম ৬ থেকে ১২ মাসের সিদ্ধান্তকেই তারা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির “টোন সেটার” হিসেবে দেখছেন।
নীতির ধারাবাহিকতা : ব্যবসায়ীদের প্রধান বার্তা : দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) ইতোমধ্যে নতুন সরকারের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে- নীতিতে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, শিল্পনীতি, করনীতি, আমদানি-রফতানি বিধিমালা ও প্রণোদনা কাঠামোয় ঘন ঘন পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। বড় শিল্প প্রকল্প বা অবকাঠামো বিনিয়োগে অন্তত ৫ থেকে ১০ বছরের নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
তাদের ভাষায়, “নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা না থাকলে পুঁজি অপেক্ষা করে বাজারে নামে না।”
প্রবৃদ্ধি কমেছে, চাপ বেড়েছে : সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য বলছে, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে- যা গত এক দশকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, কাঠামোগত সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করা গেলে প্রবৃদ্ধি ৪.৫-৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। একইভাবে বিশ্বব্যাংক বলছে, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত না হলে কর্মসংস্থান ও শিল্প সম্প্রসারণে কাক্সিক্ষত গতি আসবে না। অর্থাৎ নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ- প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধার ও তা টেকসই করা।
বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা : অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, বেসরকারি বিনিয়োগের হার জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা নি¤œ পর্যায়ের। ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধিও এক অঙ্কে।
উচ্চ সুদহার (১৩-১৪ শতাংশ পর্যন্ত) নতুন শিল্প স্থাপনে নিরুৎসাহিত করছে। উদ্যোক্তাদের মতে, সুদহার কমানো বা স্থিতিশীল না হলে বড় বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
একজন শিল্প উদ্যোক্তার ভাষায়, “ঋণের খরচ বেশি হলে উৎপাদন বাড়িয়ে লাভ করা কঠিন।”
এফডিআই কেন বাড়ছে না? : বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) এখনো বছরে ১-১.৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থনীতির আকারের তুলনায় এটি খুবই কম।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তিনটি বিষয় আগে দেখেন- নীতির স্থায়িত্ব; মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা; প্রশাসনিক স্বচ্ছতা; ব্যবসা নিবন্ধন, জমি বরাদ্দ, কর পরিশোধ ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে এফডিআই বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি : শিল্পের প্রাণরস : শিল্পখাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। গত এক দশকে দ্রুত চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন জরুরি আইনি কাঠামো ও বিশেষ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন হয়েছে। কিন্তু এতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও ভর্তুকি ও আর্থিক চাপও বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন প্রয়োজন- জ্বালানি আমদানি চুক্তিতে স্বচ্ছতা; এলএনজি ও কয়লার দীর্ঘমেয়াদি মূল্যনীতি; নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ; বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ। কারণ বিদ্যুতের দাম হঠাৎ বাড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়, যা রফতানি প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা : বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন পূর্বানুমানযোগ্যতাকে।
তার মতে : “আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে নীতি কোন দিকে যাবে তা স্পষ্ট না হলে বড় বিনিয়োগ আসে না।”
তিনি আরো বলেন, রাজস্ব বাড়াতে হবে, কিন্তু তা যেন উৎপাদন নিরুৎসাহিত না করে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানো ও সুদহার যৌক্তিক রাখা জরুরি।
রফতানি খাতের প্রত্যাশা
দেশের প্রধান রফতানি খাত পোশাকশিল্প। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বলছে, এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে শুধু নগদ প্রণোদনা নয়, দক্ষ মানবসম্পদ, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি সহায়তা বাড়ানো দরকার।
সংগঠনটির নেতাদের মতে, রফতানি বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অপরিহার্য।
তাদের মন্তব্য, “নীতির দোদুল্যমানতা থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও ঝুঁকি নিতে চায় না।”
নতুন সরকারের সামনে করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত- স্পষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপ ঘোষণা; কর ও শুল্ক কাঠামোর ধাপে ধাপে সংস্কার; ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা; ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা; বিদ্যুৎ-জ্বালানি মূল্যনীতি স্বচ্ছ করা এবং বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কার।
আস্থা ফেরানোর সময় এখনই
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আস্থা ফিরলে পুঁজি নিজে থেকেই বাজারে আসবে। কিন্তু সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে থাকবে। আগামী কয়েক মাসেই বোঝা যাবে- নতুন সরকার ধারাবাহিক ও স্থিতিশীল নীতি গ্রহণ করবে, নাকি ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করবে।
সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের শিল্প, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ পথরেখা।



