এআই মানবজাতির সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে : ইলন মাস্ক

Printed Edition
এআই মানবজাতির সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যেতে  পারে : ইলন মাস্ক
এআই মানবজাতির সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে : ইলন মাস্ক

আহমেদ ইফতেখার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক মন্তব্যে ইলন মাস্ক দাবি করেছেন, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানবজাতির সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। স্পেসএক্স, টেসলাসহ খুদে ব্লগ লেখার সাইট এক্সের মালিক ইলন মাস্কের মতে, এআই শুধু উন্নত প্রযুক্তি তৈরির মাধ্যমই নয়, ভবিষ্যতে এটি উৎপাদন, সেবা ও অর্থনীতির কাঠামোই বদলে দিতে পারে। বুদ্ধিমান রোবটের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে, যেখানে উৎপাদনক্ষমতা বর্তমানের তুলনায় অনেকগুণ বেড়ে যাবে।

গত কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে এআই দিয়ে লেখা তৈরি, সফটওয়্যার কোড লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ, ছবি ও ভিডিও নির্মাণ, অনুবাদ, গবেষণাসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করা যাচ্ছে। এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়াতে বিশ্বের বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। ফলে নতুন নতুন মডেল ও সেবা দ্রুত বাজারে আসছে এবং প্রযুক্তিটির কার্যকারিতাও বাড়ছে।

এআই ও রোবটিকস খাতে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক বিস্তার ঘটতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ সাধারণ মানুষের জন্য হিউম্যানয়েড রোবট বিক্রি শুরু করার কথাও জানিয়েছেন ইলন মাস্ক। মাস্কের ভাষায়, বয়স্ক মা-বাবার দেখাশোনা ও সন্তানদের খেয়াল রাখার জন্য পৃথিবীর প্রায় সবাই একটি রোবট চাইবে। তিনি উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, ‘রোবটটি যদি একেবারেই নিরাপদ হয়, তাহলে কে না চাইবে যে আপনার বাচ্চাদের দেখভাল করবে, পোষা প্রাণীর যতœ নেবে স্বয়ংক্রিয় রোবট। মাস্ক বলেন, ‘আমরা এত বেশি রোবট ও এআই তৈরি করব যা মানুষের চাহিদা পূরণে সবার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়বে। আমার অনুমান এক সময় মানুষের চেয়েও বেশি রোবট থাকবে।’

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এআই বিপুল তথ্য অল্প সময়ে বিশ্লেষণ করতে পারে এবং ক্লান্তিহীনভাবে দীর্ঘ সময় কাজ করার সক্ষমতা রাখে। এ কারণেই অনেকের ধারণা, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এআই মানুষের চেয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। তবে মাস্কের নতুন দাবি নিয়ে অনেকেরই দ্বিমত রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বুদ্ধিমত্তা শুধু তথ্য বিশ্লেষণ বা সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সৃজনশীলতা, আবেগ বোঝার সক্ষমতা, সাধারণ জ্ঞান, সামাজিক পটভূমি অনুধাবন ও বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা এখনো এআইয়ের নাগালের বাইরে।

বর্তমান প্রজন্মের এআই মডেলগুলো কোডিং ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছে যে, অনেকে আশঙ্কা করছেন- মানুষের তৈরি সবশেষ এআই মডেল হয়তো এগুলোই। অ্যানথ্রোপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক মনে করেন, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ ৬০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে, একটি এআই সিস্টেম মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের চেয়েও উন্নত উত্তরসূরি তৈরি করতে সক্ষম হবে।

এটি মূলত ‘রিকোর্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ (আরএসআই) নামক একটি চক্রের সূচনা করবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি মডেলের প্রথম সংস্করণ তৈরি করবে দ্বিতীয় সংস্করণকে যা হবে আগের চেয়ে দ্রুত ও দক্ষ। আবার দ্বিতীয় সংস্করণ তৈরি করবে তৃতীয় সংস্করণকে। এই চক্র চলতেই থাকবে এবং প্রতিবারই এআইয়ের কার্যকারিতা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকবে। একবার এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হলে মানুষের আর কখনোই নতুন কোনো মডেল বা কোড লেখার প্রয়োজন পড়বে না।

এআই এখন মানুষের মতো জটিল চিন্তা করার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কোনো নতুন আইডিয়া বা দক্ষতার খসড়া দিলে এটি ৩০ মিনিটের মধ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে একটি সম্পূর্ণ স্কেল প্ল্যান তৈরি করতে পারে, যা করতে মানুষের কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যেত।

এর ফলে মানুষ এখন মূলত কেবল গবেষণা পরিচালক হিসেবে কাজ করছে, যেখানে মূল কোডিং, ডিবাগিং এবং অপ্টিমাইজেশনের কাজ মডেলগুলো নিজেই করছে। এই উৎপাদনশীলতা যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি ভীতিজনক। কারণ মানুষের ভূমিকা কমে গেলে একসময় পুরো ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেতে পারে। এর শেষ পরিণতি হতে পারে এমন এক ব্যবস্থা, যা মডেলের মাধ্যমে তৈরি হবে, মডেলের লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করবে এবং তার নিরাপত্তা যাচাইও করবে কেবল মডেলই।

মানুষের মতো বিস্তৃতভাবে চিন্তা ও যুক্তি প্রয়োগ করতে সক্ষম কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা অর্জনে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি। তাদের ধারণা, এ লক্ষ্য অর্জনে আরো বহু বছর, এমনকি কয়েক দশক সময় লাগতে পারে। আবার অন্যদের মতে, বর্তমান অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকলে সেই সময়সীমা অনেক কমও হতে পারে। আর তাই মাস্কের মন্তব্য যেমন অনেকের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে, তেমনি সংশয়েরও জন্ম দিয়েছে।