ঢাবিতে চব্বিশের ১৫ জুলাইয়ে হামলা

অভিযোগপত্র থেকে বাদ প্রায় ৭০ শতাংশ আসামি

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে হামলার ঘটনায় করা মামলার তদন্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মামলায় নাম থাকা ৩৯১ আসামির মধ্যে ২৬০ জনকেই অভিযোগপত্র থেকে বাদ দিয়েছে পুলিশ। ফলে প্রাথমিকভাবে আসামিদের প্রায় ৭০ শতাংশেরই পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রে নাম বাদ পড়েছে।

তাদের মধ্যে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন হল শাখার বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ওই দিনের হামলায় সরাসরি অংশ নেয়ার ছবি ও অন্যান্য তথ্য থাকার দাবি করেছেন আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা।

অভিযোগপত্রে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের নাম বাদ দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদি, সাক্ষী এবং আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রশ্ন, হামলার ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান তথ্য-প্রমাণ থাকার দাবি করা হচ্ছে, তাদের অনেকের নাম কেন অভিযোগপত্রে নেই?

মামলায় আসামি ছিলেন ৩৯১ জন

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাবির ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার গত বছরের ২১ অক্টোবর শাহবাগ থানায় এ মামলা করেন।

ওই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ৩৯১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি ৮০০ থেকে ১ হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

একই ঘটনায় শাহবাগ থানায় আরেকটি মামলা করেন এনসিপির নেতা ও আইনজীবী আরমান হোসেন। সেই মামলায় ২২০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ১৫০ থেকে ২০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। দু’টি মামলার তদন্ত শুরুতে আলাদা কর্মকর্তার অধীনে থাকলেও পরে উভয় মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তাকে।

এরপর তদন্ত কর্মকর্তা মাসুম সরদার আরমান হোসেন ‘চূড়ান্ত প্রতিবেদন’ দাখিল করে মামলা নিষ্পত্তির সুপারিশ করেন। সেখানে পর্যাপ্ত তথ্য, প্রমাণ ও সাক্ষী না পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। ফলে ওই মামলায় কোনো আসামির বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনা হয়নি।

অন্য দিকে মাহিন সরকারের মামলায় ৩৯১ আসামির মধ্যে ২৬০ জনকে বাদ দিয়ে ১৩১ জনকে অভিযোগপত্রে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আরমান হোসেনের মামলার ৬৪ জনকে এই অভিযোগপত্রে যুক্ত করা হয়েছে। সবমিলিয়ে ১৯৫ জনের বিরুদ্ধে বিচার চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ দু’টি মামলার তদন্তের ফলাফল মিলিয়ে ১৯৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সুপারিশ করা হলেও প্রথম মামলায় নাম থাকা ৩৯১ জনের মধ্যে ২৬০ জন অভিযোগপত্রে স্থান পাননি।

হামলায় অংশ নেয়ার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে

অভিযোগপত্র থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের পরিচিত নেতাকর্মী রয়েছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, ১৫ জুলাই ঢাবির মল চত্বরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় তাদের কয়েকজন সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।

হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রলীগ ইউনিটের আট নেতাকর্মী সাখাওয়াত হোসেন শান্ত, আইনুল ইসলাম মাহবুব, সাংস্কৃতিক সম্পাদক শোয়াইব আহমেদ সাজিব, উপদফতর সম্পাদক আরাফাত হোসেন মাহিন, উপসম্পাদক এনামুল হক পলাশ, সাংগঠনিক সম্পাদক মাকসুদুর রহমান জিহাদ, আহসান হাবিব রাব্বি ও সনেট ইসলামের নাম অভিযোগপত্রে নেই। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ওই হামলায় তাদের সরাসরি অংশগ্রহণের ছবি ও অন্যান্য তথ্য রয়েছে।

কবি জসীমউদ্দীন হল ছাত্রলীগের উপদফতর সম্পাদক সাকিব আরাফাত মৃধা ও সদস্য মোহাম্মদ ইউসুফের নামও অভিযোগপত্রে রাখা হয়নি। হামলার সময় তাদের হাতে লাঠি ও রড দেখা গেছে এমন ছবি থাকার দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ছাত্রলীগের দফতর সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম পান্থ, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন ও হারুন-উর রশীদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাহিদ ভূঁইয়া এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শরীফ আহমেদ মুনিমসহ আরো কয়েকজনের নাম অভিযোগপত্রে নেই।

তবে অভিযোগপত্র থেকে বাদ পড়া এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্তে কী ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল বা তাদের বাদ দেয়ার নির্দিষ্ট কারণ কী এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তের সাথেও মিল নেই

পুলিশের তদন্তের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তদন্তের ফলাফলেরও পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৫ সালের মার্চে ১৫ জুলাইয়ের হামলায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১২২ শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠিত তথ্য অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনে কয়েকজন শিক্ষার্থীর হামলায় অংশ নেয়ার প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

তাদের মধ্যে মহসীন হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল করিম রিয়াদ, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন এবং জসীমউদ্দীন হল ছাত্রলীগের সদস্য মোহাম্মদ ইউসুফের নাম ছিল। কিন্তু পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রে এই তিনজনের কারো নাম নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল, তাদের নাম পুলিশের অভিযোগপত্রে না থাকায় তদন্তের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে কি না সে প্রশ্নও উঠেছে।

মামলার এক নম্বর সাক্ষী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মাসুমও অভিযোগপত্র নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ১৫ জুলাইয়ের হামলায় যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে এটাই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ক্যাম্পাসে তখন ছাত্রলীগের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এমন অনেকের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি হতাশাজনক।

অভিযোগপত্র তৈরির ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক লেনদেন বা অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন কোনো সরকারি সংস্থার মাধ্যমে তদন্তের দাবিও জানান তিনি।

এ বিষয়ে ঢাবি প্রশাসনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগপত্রের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তদন্ত কর্মকর্তা মাসুম সরদারের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।