সংসদ প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্যদের (এমপি) ‘ঋণখেলাপি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে কি না- এ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে বিতর্ক হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দাবি করেছেন, বিদ্যমান নির্বাচনী আইন অনুযায়ী বর্তমান সংসদের কোনো সদস্য ঋণখেলাপি নন; তারা সর্বোচ্চ ঋণগ্রস্ত হতে পারেন। অন্য দিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, নির্বাচনের আগে সামান্য অর্থ পরিশোধ করে ঋণ পুনঃতফসিল এবং আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার বাস্তবতা সবারই জানা। আর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদে এতসংখ্যক ঋণখেলাপি থাকলে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে উদ্বেগ
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা দেশের ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিনিয়োগের বিষয়টি বাদ দিলেও প্রশ্ন থেকে যায়- ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দেবে কিভাবে? তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট মন্দ ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর সাথে অবলোপন, পুনঃতফসিল এবং মামলার কারণে আটকে থাকা অর্থ যোগ করলে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা, যা দেশের মোট ঋণের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো সরকারের আর্থিক চাহিদা পূরণে সক্ষম না হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন টাকা ছাপাতে হয়, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়।
‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ মন্তব্য ঘিরে আপত্তি
রুমিন ফারহানার বক্তব্যের পর ফ্লোর নিয়ে সংসদের মর্যাদার প্রশ্ন তোলেন গাজীপুর-৫ আসন থেকে নির্বাচিত সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন। তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সংসদ দেশে-বিদেশে সম্মান অর্জন করেছে। অতীতে ভোটারবিহীন নির্বাচনের অভিযোগ থাকলেও বর্তমান সংসদের মর্যাদা ভিন্ন।
তিনি অভিযোগ করেন, বক্তব্য দিতে গিয়ে সংসদ সদস্যরাই কখনো কখনো এমন মন্তব্য করেন, যা সংসদের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করে। ‘ঋণখেলাপিদের এই সংসদ’ ধরনের মন্তব্যকে তিনি আত্মঘাতী আখ্যা দিয়ে বলেন, আইন অনুযায়ী একজন ঋণখেলাপি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। ফলে এ ধরনের শব্দ ব্যবহার সংসদের মর্যাদাহানিকর।
বক্তব্যের শেষে তিনি স্পিকারের কাছে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ শব্দবন্ধ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেয়ার (এক্সপাঞ্জ) অনুরোধ জানান এবং ভবিষ্যতে এমন মন্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
‘মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এ সংসদকে ঋণখেলাপিদের সংসদ বলবে’
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রথম অধিবেশনেই তিনি অনেক সংসদ সদস্যের ঋণখেলাপির তথ্য উল্লেখ করেছিলেন, যদিও সম্মানের খাতিরে নাম প্রকাশ করেননি। তার দাবি, যেসব রাজনৈতিক দল ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিয়ে সংসদে পাঠায়, তার দায় তাদেরই। সংসদে এতসংখ্যক ঋণখেলাপি থাকলে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এটিকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলে অভিহিত করবে।
তিনি স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সংসদ যদি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হয়, তাহলে সংসদের ভেতরে ঋণখেলাপিদের ঋণখেলাপি বলা যাবে না- এমন অবস্থান গ্রহণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাই এ ধরনের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার প্রয়োজন নেই বলে মত দেন তিনি।
‘ঋণগ্রস্ত আর ঋণখেলাপি এক নয়’
বিতর্কের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদের প্রতিটি সদস্যের প্রতি সম্মান দেখানো সবার দায়িত্ব। তিনি বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং বিদ্যমান নির্বাচনী আইন অনুযায়ী ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার অযোগ্য। ফলে বর্তমান সংসদের কোনো সদস্যকে ঋণখেলাপি বলা আইনগতভাবে সঠিক নয়।
মন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে ঋণগ্রস্ত হতে পারেন, কিন্তু সেটি তাকে ঋণখেলাপি বানায় না। ঋণগ্রহীতা ও ঋণখেলাপির মধ্যে মৌলিক আইনি ও বাস্তব পার্থক্য রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যাংকসংক্রান্ত মামলা বা ব্যক্তিগত আইনি জটিলতা থাকতে পারে। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেসব নিষ্পত্তি হয়ে হাইকোর্ট বা আপিল বিভাগ যদি তাকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে, তাহলে তাকে ঋণখেলাপি বলা যায় না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বারবার ঋণখেলাপি আখ্যা দেয়া মানহানিকর এবং তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেয়া উচিত।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আবারো ফ্লোর নিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য অনুযায়ী বর্তমান সংসদের সদস্যদের কাছে দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা প্রায় ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। আইনজীবী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে অল্প কিছু অর্থ পরিশোধ করে কিভাবে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়, তা তিনি ভালোভাবেই জানেন। একইভাবে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হলে কিভাবে রিট আবেদন করে স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া হয় এবং পরে আবার ঋণের সুদ পরিশোধ বন্ধ হয়ে যায়, সেই প্রক্রিয়াও সবার অজানা নয়। তার মতে, কেবল আইনি কৌশলের মাধ্যমে সাময়িকভাবে নির্বাচন করার সুযোগ পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক দায়বদ্ধতা শেষ হয়ে যায় না।
বাজেটের সুফল নিয়ে সন্দিহান
এ দিকে ঝিনাইদহ থেকে নির্বাচিত বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য আলী আজম মো: আবু বকর বলেন, সরকার একটি ভালো বাজেট দেয়ার চেষ্টা করেছে। তবে বাজেটের বরাদ্দ প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তার মতে, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত না হলে বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থার বিধান দিয়েছেন। কিন্তু মানুষ নিজস্বভাবে সুদভিত্তিক অর্থনীতি চালু করেছে, যা কখনোই মানুষের প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। তিনি জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে গবেষণার উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি দুর্নীতি রোধে সরকারি ঠিকাদারদের কাজ অন্যের কাছে বিক্রি করার প্রবণতা বন্ধে আইন প্রণয়নের পরামর্শ দেন। বাজেটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার দাবিও জানান তিনি।
বাজেট বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে- আইনমন্ত্রী
আলী আজম মো: আবু বকরের বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, একসময় বাজেট উপস্থাপনের পর ‘গরিব মারার বাজেট’ বা ‘বড়লোকের বাজেট’ বলে সমালোচনা হতো। কিন্তু এবারের বাজেটকে ঘিরে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি, কারণ এটি গরিব, মধ্যবিত্ত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী ও কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের স্বার্থ বিবেচনায় প্রণয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় এই বাজেট প্রণীত হয়েছে এবং এটি কোনো একদিনের চিন্তার ফল নয়। বাজেটকে ‘স্বপ্নবিলাসী’ বলার জবাবে মন্ত্রী বলেন, যে জাতি স্বপ্ন দেখতে পারে না, সে জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। উচ্চাভিলাষ ছাড়া উন্নয়নও সম্ভব নয়।
আইনমন্ত্রী আরো জানান, বাজেটে কৃষি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হয়েছে। কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড, উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি রাখা হয়েছে। একই সাথে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে অতিরিক্ত প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, যুব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরো বলেন, অর্থপাচার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সরকার বাস্তবমুখী ও উন্নয়নবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করেছে। খাল ও নদী পুনঃখনন, ব্যাপক বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এ ছাড়া মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর-সুবিধা বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, জনগণের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোও বাজেটে গুরুত্ব পেয়েছে।
ঝিনাইদহ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মতিউর রহমান বলেন, সরকার বাজেট নিয়ে জনগণকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে সবক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি দাবি করেন, এই বাজেট বাস্তবায়নে জনগণকে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা সুদ বহন করতে হবে, যার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। তার ভাষায়, বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে তেমন আলোচনা হচ্ছে না এবং এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনও এর বিরোধিতা করেনি।
গতকাল বাজেট আলোচনায় আরো অংশ নেন মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, আতিকুর রহমান মুজাহিদ, শহীদুল ইসলাম বাবুল, হাফিজুল ইসলাম ও নেওয়াজ হালিমা আরলী প্রমুখ।



