ডয়েচে ভেলে
ইরানের চলমান অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব কাছ থেকে’ পর্যবেক্ষণ করছে উল্লেখ করে দেশটিতে ‘শক্তিশালী হামলা’ চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
স্থানীয় সময় রোববার সন্ধ্যায় এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানে যা ঘটছে তা আমরা খুব কাছ থেকে দেখছি। আগের মতো যদি তারা মানুষ হত্যা শুরু করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশটিতে শক্তিশালী আঘাত আসবে বলে আমি মনে করি।’
ইরানে চলমান বিক্ষোভ ঘিরে এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি। এর আগে ১ জানুয়ারি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেছিলেন, ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের যদি ইরান গুলি করে ও সহিংসভাবে হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসতে প্রস্তুত।’ একই পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমরা সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত, যেকোনো সময় ইরানে পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে।’
এরই মধ্যে ইরানে অর্থনৈতিক সঙ্কটকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত সপ্তাহে তেহরানের খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানের রিয়ালের মান রেকর্ড সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে আসে। এর পরপরই দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও ধর্মঘট শুরু হয়।
ইরান ইন্টারন্যাশনাল নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের ২৬টি প্রদেশের ৭৮টি শহরের মধ্যে অন্তত ২২টি স্থানে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভকে ‘বিদেশী মদদপুষ্ট উসকানিদাতাদের কাজ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি আরো কঠোর দমন-পীড়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘কিছু উত্তেজিত লোক ও ভাড়াটে শত্রু ইসলাম ও ইরানের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে। প্রতিবাদ বৈধ, কিন্তু প্রতিবাদ আর দাঙ্গা এক নয়। কর্মকর্তাদের উচিত প্রতিবাদকারীদের সাথে কথা বলা। তবে দাঙ্গাবাজদের সাথে কথা বলা অর্থহীন।’
আলোচনায় আগ্রহের ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্রের
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক ও আইনবিষয়ক উপপ্রধান কাজেম গরিবাবাদি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন তেহরানের সাথে আলোচনায় আগ্রহী হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আলোচনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।’
তবে গরিবাবাদি স্পষ্ট করে বলেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে একটি নিছক বৈঠকের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যদি আমরা ফলাফলমুখী আলোচনা চাই, তাহলে প্রয়োজনীয় শর্তাবলি পূরণ করতে হবে। গারিবাবাদি সাম্প্রতিক ১২ দিনের সঙ্ঘাতের প্রভাবের ওপর জোর দিয়ে বলেন, এটি ‘ইসরাইলের অজেয়তার মিথ ভেঙে দিয়েছে’ এবং ইরানের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর জোর দিয়েছে। তিনি জনসাধারণকে আশ্বস্ত করেন, ইরান দ্বিধা ছাড়াই কূটনীতির জন্য যেকোনো সুযোগ গ্রহণ করবে।
তিনি উল্লেখ করেন, সঙ্ঘাত-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাথে ইরানের সম্পর্ক ‘মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কূটনীতি এখনো শেষ পর্যায়ে পৌঁছেনি। কিন্তু যুদ্ধের সময়, আলোচনা মানে ডিক্টেশন এবং আত্মসমর্পণ।’
২০২৫ সালের ১৩ জুন ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনার প্রক্রিয়া চলাকালীন ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে এক স্পষ্ট এবং বিনা উসকানিতে আগ্রাসন শুরু করে। ইসরাইলি আক্রমণের ফলে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হয়- যার ফলে দেশটিতে কমপক্ষে এক হাজার ৬৪ জন নিহত হয়। তাদের মধ্যে সামরিক কমান্ডার, পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং সাধারণ বেসামরিক নাগরিকও ছিলেন। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে তিনটি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধে প্রবেশ করে। জবাবে ইরানি সশস্ত্রবাহিনী দখলকৃত অঞ্চলজুড়ে (ইসরাইল) কৌশলগত স্থানগুলোর পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার বৃহত্তম আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি কাতারের আল-উদেইদে মিসাইল ছোড়ে। ২৪ জুন ইরান ইসরাইলি সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক অভিযানের মাধ্যমে সঙ্ঘাত বন্ধ করতে সক্ষম হয়।



