ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর চাপে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা এবং লোকসভায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক স্ট্যাডিং কমিটির চেয়ারম্যান শশী থারুরের মতে, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এই বিব্রতকর পরিস্থিতি আমরা নিজেরাই ডেকে এনেছি।
অন্য দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর অলটারনেটিভের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ক্রীড়াকে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে ফেলাকে দুর্ভাগ্যজনক হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।
আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের পক্ষে খেলতে চুক্তিবদ্ধ হওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের নির্দেশনায় বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত ‘অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক’ হিসাবে উল্লেখ করে শশী থারুর ইনডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসী পাঠাচ্ছে না। পরিস্থিতি মোটেও তুলনাযোগ্য নয়। তা ছাড়া, এই দুই দেশের সাথে আমাদের সম্পর্কও ভিন্ন। বাংলাদেশের সাথে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক পাকিস্তান থেকে আলাদা। এই দুই দেশকে এক সরল সমীকরণে ফেলা যায় না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শশী থারুর বলেন, আমি শুরু থেকেই এই বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেছি। আমি বেশ কিছু দিন ধরেই যুক্তি দিয়ে আসছি যে খেলাধুলাকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা উচিত। রাজনৈতিক ব্যর্থতার মূল বোঝা খেলাধুলাকে বহন করা উচিত নয়। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্র কয়েকদিন আগে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন, সেখানে তিনি সেই ব্যক্তির সাথে দেখা করেছিলেন যিনি সে দেশে পরবর্তী নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রতিক নৃশংসতাকে কেন্দ্র করে রাস্তায় অরাজক উপাদানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ইতোমধ্যেই সরকারকে অনুরোধ করছি। এই রকম একটি নাজুক মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত, এটি আমার কাছে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং অযৌক্তিক মনে হচ্ছে। এটাও উদ্বেগজনক যে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষোভ নীতিকে চালিকা শক্তি হিসেবে দেখেছি। আমার মনে হয় কিছু বিষয় এই ধরনের জিনিসের বাইরে হওয়া উচিত।
এদিকে ‘ক্রীড়াকে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে ফেলা দুর্ভাগ্যজনক’ মন্তব্য করে অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় ক্রীড়াকে অনেক সময়ই একটি হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। আমাদের আশা থাকবে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে রাজনৈতিক টানাপড়েন যাতে আর না বাড়ে। রাজনীতিকদের উদ্দেশ্য থাকে তাদের ভোটারদের খুশি রাখা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারত- উভয় দেশেই নির্বাচন হয়ে গেলে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমে আসবে বলেই ধরে নেয়া যায়। সে জন্য আমাদের কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাহীনতার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড ভারতে আসন্ন আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘু ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়ে যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, তা কূটনৈতিক টানাপড়েনে রূপ নিয়েছে। দুই প্রতিবেশী দেশের জনগণের মধ্যে এক ধরনের অসহিষ্ণুতা দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়টা যথাযথভাবে মোকাবেলা করা দরকার। কারণ এর মধ্যে নিরাপত্তার ইস্যুটি চলে আসে। এতে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী ও ভারতে বাংলাদেশবিরোধী মানোভাব চাঙ্গা হয়ে উঠে।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল ক্রীড়ার ক্ষেত্রে নয়, বরং সমাজের জন্যও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে লাভ কোনো পক্ষেরই হয় না, বরং ক্ষতি দুই দেশের জনগণের।
প্রসঙ্গত ২০২৬ আইপিএলের নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মুস্তাফিজকে দলে নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে যা আইপিএলে রেকর্ড পারিশ্রমিক। কিন্তু মুস্তাফিজের খেলা নিয়ে গত কিছুদিন ধরে নানা বিতর্কের খবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছিল। গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে। সেই ঘটনা এবং বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের নানা অভিযোগে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু অংশ এবং উগ্র ধর্মীয় কিছু সংগঠন মুস্তাফিজের আইপিএলে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। উগ্রবাদীদের হুমকির মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সচিব দেবাজিৎ সাইকিয়া মুস্তাফিজকে বাদ দিতে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেন। পরে কলকাতা নাইট রাইডার্স আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাঁহাতি পেসারকে দল থেকে বাদ দেয়ার ঘোষণা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তার কারণে ভারতে টি-২০ বিশ্বকাপ খেলতে অপারগতা প্রকাশ করে বাংলাদেশের খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিতে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সাথে বাংলাদেশ সরকার টি-২০ বিশ্বকাপ খেলা সম্প্রচারের ওপর নিধেষাজ্ঞা আরোপ করেছে।



