হাওরে সোনালি স্বপ্নের সলিলসমাধি

হাহাকার আর ঋণের বোঝায় দিশেহারা কৃষক

বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, সময়মতো কাজ শেষ না হওয়া ও টেকসই বাঁধ না দেয়ায় পাহাড়ি ঢলে তা সহজেই ভেঙে পড়ছে

Printed Edition
মৌলভীবাজারের হাওরে পানিতে ডুবে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় তুলছেন দুই কৃষক
মৌলভীবাজারের হাওরে পানিতে ডুবে যাওয়া ধান কেটে নৌকায় তুলছেন দুই কৃষক |ছবিটি পাঠিয়েছেন নয়া দিগন্ত মৌলভীবাজার প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ

মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরজুড়ে যেন নেমে এসেছে নীরব এক বিপর্যয়। কয়েক দিন আগেও যেখানে দিগন্তজোড়া সোনালি ধানের ঢেউ কৃষকের মনে জাগিয়েছিল আশার আলো, সেখানে আজ শুধুই অথৈ পানি। টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ধানক্ষেতগুলোকে পরিণত করেছে পানির নিচে ডুবে থাকা এক বিষণœ প্রান্তরে। বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটার যে দৃশ্য এখন হাওরে দেখা যাচ্ছে, তা কেবল ফসল সংগ্রহের লড়াই নয়; বরং চরম অভাব আর অনাহারের বিরুদ্ধে এক নীরব হাহাকার।

মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরপারের রক্তা গ্রামের কৃষক নোমান মিয়ার করুণ আকুতি এখন পুরো হাওরাঞ্চলের প্রতিচ্ছবি। পাঁচজনের সংসার চালানো নোমান মিয়া বলেন, ‘বুক পানিতে নেমে ধান তুলতেছি, কিন্তু শ্রমিক পাই না। জোঁকের কামড় খেয়েও ধান কাটতে হচ্ছে, কারণ সারা বছরের খোরাকি জোগাড় করতে না পারলে না খেয়ে মরতে হবে। ১৬ বিঘার মধ্যে পাঁচ বিঘা কোনোমতে তুলছি, আর সব শেষ।’

একই চিত্র সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক গ্রামের কৃষক রহিছ উদ্দিন চৌধুরীর। তার ৫০ কিয়ার জমি এখন পানির নিচে। শ্রমিক সঙ্কটে তিনি দিশেহারা। বর্গাচাষি ফারুক মিয়া ঋণ করে অন্যের জমি চাষ করেছিলেন। একটি ধানও না কাটতে পেরে তিনি এখন নির্বাক। এসব কৃষকের চোখে এখন কেবল অন্ধকার- এক দিকে ঋণের বোঝা, অন্য দিকে পরিবারের ভরণপোষণের চিন্তা।

মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ- এই দুই জেলায় বোরো ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে, তার সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে বড় ধরনের ব্যবধান লক্ষ করা গেছে। মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মতে, জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর আবাদের মধ্যে দুই হাজার ৪৪২ হেক্টর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১৮ হাজার কৃষক।

অন্য দিকে সুনামগঞ্জের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। জেলা কৃষি বিভাগের দাবি, প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি ভিন্ন। তারা বলছেন, হাওরের অর্ধেক ধান এখনো পানির নিচে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। সুনামগঞ্জে এবার দুই লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল, যার বাজার মূল্য ছিল প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কেবল স্থানীয় বিপর্যয় নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সঙ্কেত।

হাওরে পানি বেড়ে যাওয়ায় ধান কাটার যন্ত্র ‘কম্বাইন হারভেস্টার’ বা ‘রিপার’ চালানো যাচ্ছে না। ফলে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ধান কাটার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় শ্রমিক অনেক কম। বাইরের জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা এই প্রতিকূল অবস্থায় কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করছেন। বাড়তি মজুরি দিয়েও মিলছে না শ্রমিক। একটি নৌকা ভাড়া নিতে হলেও গুনতে হচ্ছে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। মৌলভীবাজারের কৃষকদের অভিযোগ, কাউয়াদিঘি হাওরের পানি নিষ্কাশনের জন্য কাশিমপুর পাম্প হাউজ ঠিকমতো না চলা এবং জ্বালানি সঙ্কটের কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।

কৃষক যেটুকু ধান কোনোমতে পানি থেকে তুলে ডাঙ্গায় নিয়ে আসছেন, সেটুকু নিয়েও বিপত্তির শেষ নেই। টানা বৃষ্টি আর রোদ না থাকায় ধান শুকানো যাচ্ছে না। খলায় স্তূপ করে রাখা ধানে চারা গজিয়ে যাচ্ছে। পচা ধানের উৎকট গন্ধে ভারী হয়ে উঠছে হাওরের বাতাস। শুধু ধান নয়, পচে যাচ্ছে গোখাদ্য খড়ও। ফলে হালের বলদ আর দুধের গাভী নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন খামারিরা। বাজারে ধানের দামও এখন তলানিতে, তাই বিক্রিরও কোনো পথ নেই।

কেন প্রতি বছর আগাম বন্যা ঠেকানো যাচ্ছে না- এই প্রশ্ন এখন হাওরবাসীর মুখে মুখে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩টি হাওরের ৬০৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধ নির্মাণে পিআইসির মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়া এবং টেকসই বাঁধ না দেয়ায় পাহাড়ি ঢলে তা সহজেই ভেঙে পড়ছে।

আবহাওয়া তথ্যানুসারে, এবার মার্চ ও এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এপ্রিলে সুনামগঞ্জে যেখানে ২৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টির কথা ছিল, সেখানে ৩৯৮ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল মোকাবেলায় বিদ্যমান বেড়িবাঁধগুলো সক্ষমতা হারিয়েছে।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ইউএনও, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও পিআইও সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এই তালিকা করছে। গত ৫ মে সরকারের মন্ত্রীরা সুনামগঞ্জ সফর করে সহায়তা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। তবে কৃষকদের দাবি, কেবল তালিকা নয়, অবিলম্বে দাদন ও মহাজনি ঋণের হাত থেকে তাদের বাঁচাতে আর্থিক প্রণোদনা এবং পরবর্তী চাষাবাদের জন্য বিনামূল্যে সার ও বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

হাওরের এই নীরব বিপর্যয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন কৃষক। বানের জলে ভেসে গেছে ঘামের ফসল, ডুবে গেছে এক মৌসুমের আশা। দাদন ব্যবসায়ী ও মহাজনের ঋণের বোঝা শোধ হবে কিভাবে- সেই চিন্তায় ঘুম নেই হাজারো কৃষকের। প্রকৃতির বৈরিতা আর প্রশাসনিক গাফিলতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে হাওরের কৃষকরা আজ দিশেহারা। সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান না এলে দেশের এই অন্নদাতারা চিরতরে নিঃস্ব হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।