নয়া দিগন্ত ডেস্ক
সারা দেশে তীব্র দাবদাহের মধ্যে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কয়লা ও গ্যাস সঙ্কটে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিন-রাতে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানার উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেচ কার্যক্রম। বিশেষ করে আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চরমভাবে বিঘিœত হচ্ছে। বিদ্যুৎ সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের দাবিতে দেশের কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ এবং মানববন্ধনের ঘটনা ঘটেছে।
ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, ঝালকাঠিতে তীব্র গরমে অসহনীয় লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ অফিসের অনিয়মের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে নাগরিক সমাজ। গত রোববার ঝালকাঠি প্রেস ক্লাবের সামনে মানব কল্যাণ সোসাইটির উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। বক্তারা অভিযোগ করেন, দিন-রাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত। এর ওপর বিদ্যুৎ অফিসের প্রশাসনিক অনিয়ম, গ্রাহক হয়রানি ও ভুতুড়ে বিলের কারণে ক্ষোভ বাড়ছে। মানববন্ধন থেকে অবিলম্বে স্বচ্ছসেবা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, তীব্র গরম ও জ্বালানি সঙ্কটে চুয়াডাঙ্গায় স্মরণকালের ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয় নেমে এসেছে। জেলায় দৈনিক ১২-১৫ বার লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রিড উপকেন্দ্রগুলোতে চাহিদার তুলনায় ৩৫-৪৬ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ ও ওজোপাডিকোর ১১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৬৯-৭৬ মেগাওয়াট। ফলে আউশ ও আমনের সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির এবং পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ না বাড়লে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা দেখছেন না স্থানীয় প্রকৌশলীরা।
মাধবদী (নরসিংদী) সংবাদদাতা জানান, শিল্পাঞ্চল মাধবদীতে গত এক মাস ধরে দিনে-রাতে গড়ে ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। এতে পাঁচ শতাধিক গার্মেন্ট, টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিপুল লোকসান গুনছেন মালিকরা। অনেকেই শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কথা ভাবছেন। ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা মাধবদীকে বিশেষ শিল্প এলাকা ঘোষণা করে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবি জানিয়েছেন, অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জিএম জানান, লোড কম থাকা ও মহাসড়কের কাজের কারণে এ সাময়িক সমস্যা হচ্ছে।
ভালুকা (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুতের ঘনঘন লোডশেডিংয়ে ভালুকার পৌর এলাকাসহ গ্রামাঞ্চলের মানুষ অতিষ্ঠ। প্রচণ্ড গরমে রাতে দুই-তৃতীয়াংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না, যা এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি করছে। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ জানায়, ভালুকা ও গফরগাঁওয়ে ১৩০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৬০-৬৫ মেগাওয়াট। অন্য দিকে বিপিডিবি জানায়, তাদের ২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ১২-১৩ মেগাওয়াট। চাহিদার অর্ধেক ঘাটতি থাকায় এই তীব্র ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
দেলদুয়ার (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে টাঙ্গাইল মহাসড়ক এক ঘণ্টা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন দেলদুয়ার ও মির্জাপুরের ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে বিদ্যুৎ বিভাগের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। এদিকে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আওয়াল বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, নাগরপুরে ২৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে মাত্র ৫-১০ মেগাওয়াট এবং দেলদুয়ারে ২২ মেগাওয়াটের বিপরীতে অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় জনজীবন ও সেচব্যবস্থা বিপর্যস্ত হচ্ছে।
কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, অসহনীয় লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ জনতা নেত্রকোনার কেন্দুয়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। গত রোববার সকালে আর্জেন্টিনা বনাম জর্দানের বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অফিসের জানালাসহ বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জোনাল অফিসের ডিজিএম প্রকৌশলী ওমর ফারুক জানান, উপজেলায় ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন সঙ্কটের কারণে মাত্র ৭-৮ মেগাওয়াট সরবরাহ মিলছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এ ঘটনা ঘটেছে।
ভুরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে লোডশেডিং চরম আকার ধারণ করায় আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। সামান্য বাতাসেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা বিদ্যুৎ নীতি ও অনাকাক্সিক্ষত দাম বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। জোনাল অফিসের ডিজিএম মিজানুর রহমান জানান, উপজেলার ২১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলছে। দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ডুমুরিয়া (খুলনা) সংবাদদাতা জানান, ডুমুরিয়া উপজেলায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে লোডশেডিং চরমে পৌঁছেছে। শাহপুর সাব জোনাল অফিস জানায়, এক লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের জন্য ২৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ১১ মেগাওয়াট। প্রতিদিন পড়ার ও পরীক্ষার সময়ে বিদ্যুৎ না থাকায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে কৃষি ও ব্যবসা। খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আজগর লবী জানান, সমস্যা সমাধানে তিনি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করছেন।



