২০৩০ এর মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট

বাজেটে আসতে পারে নির্দেশনা

Printed Edition

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ

বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু আমদানিনির্ভর জ্বালানি, গ্যাসসঙ্কট ও বৈশ্বিক বাজারে দামের ওঠানামা দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় সৌরবিদ্যুৎকে ভবিষ্যতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও টেকসই শক্তির উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোকের কারণে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।

আমদানিনির্ভর বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরশক্তি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সম্প্রসারণে নীতিগত পরিবর্তন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে এবারের বাজেটে আসতে পারে নির্দেশনা।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন : বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো ও অর্থনৈতিক বোঝা দূর করতে সরকার আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য ও দেশীয় জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছে। আগামী ৫ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও আমদানির ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।

২০% বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতির আওতায় সৌরবিদ্যুৎকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি জমির পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও উৎসাহিত করা হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি শিল্প খাত, সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ অঞ্চলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (রুপটপ সোলার) সম্প্রসারণের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার বৃহত্তর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যেখানে সৌরবিদ্যুৎকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিপুল ঘাটতি ও ভর্তুকির বোঝা

বর্তমানে দেশে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২,৩৩২ মেগাওয়াট। তবে চাহিদা অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১৪,৫০০ থেকে ১৫,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে দেশে জ্বালানি খাতে সরকারকে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা বার্ষিক হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। মূল বাজেটে বিদ্যুতের জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলেও, ঘাটতি মেটাতে বিদ্যুৎ বিভাগ আরো ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি চেয়েছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ প্রায় ১২ টাকা, যা বিক্রি হয় গড়ে সাত টাকার কিছু বেশিতে। ফলে প্রতি ইউনিটে সরকারকে প্রায় ৪ থেকে ৫ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম বলেন : পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতি ইউনিট তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার টাকা এবং পারমাণবিক বিদ্যুতের খরচ ৩ থেকে ৪ টাকা। সেখানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ সবচেয়ে কম- প্রতি ইউনিট প্রায় ২.৫০ থেকে ৩.৫০ টাকা। অথচ বাংলাদেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় ১৩ টাকা! বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌক্তিক মুনাফা দিয়ে মাত্র সোয়া চার টাকায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এই খাতের দুর্নীতি রোধ এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে ন্যায্যমূল্যে জনগণের মাঝে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে হবে।

তিনি আরও যোগ করেন, দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলা এবং উৎপাদন খরচ কমাতে ‘তৃতীয় প্রজন্মের সৌরবিদ্যুৎ’ প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।

সম্ভাবনা ও তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি

গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ৪.২ থেকে ৫.৫ কিলোওয়াট ঘণ্টা সৌর বিকিরণ পাওয়া যায়, যা সৌরশক্তি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই বছরজুড়ে পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকে।

বর্তমানে প্রচলিত সিলিকনভিত্তিক সৌর প্যানেলের তুলনায় ‘তৃতীয় প্রজন্মের সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি’ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এই প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে বেশি দক্ষ, হালকা এবং কম জায়গায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। উন্নত উপকরণ ব্যবহারের ফলে কম আলোতেও এটি ভালো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ছাদভিত্তিক প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। এ ছাড়া গ্রামীণ অবৈদ্যুতিকৃত এলাকায় ‘সৌর হোম সিস্টেম’ ইতোমধ্যে লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।

চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়

সৌরবিদ্যুৎ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো- বড় প্রকল্পের জন্য জমির সীমাবদ্ধতা, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয় এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ ধরে রাখার (স্টোরেজ) প্রযুক্তিগত সমস্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশাল পরিমাণের সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হলে দেশের গ্রিড ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক, নমনীয় ও স্মার্ট করতে হবে, অন্যথায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন : বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানো ও অর্থনৈতিক বোঝা দূর করতে সরকার আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য ও দেশীয় জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছে। আগামী ৫ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও আমদানির ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।

সঠিক নীতি বাস্তবায়ন, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ খাতে এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা।