- গাজায় বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট চরমে, বাড়ছে রোগব্যাধি
- ডিজিটাল অর্থপ্রদানের বিঘেœ গাজায় নিত্যজীবন অচল
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইলি হামলা ও সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। গত এক সপ্তাহে অন্তত ২৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আর যুদ্ধবিরতির পর থেকে মোট নিহতের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আলজাজিরা। একই সাথে গাজায় নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে ইসরাইলি বাহিনী পূর্বাঞ্চলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ রেখা আরো সম্প্রসারণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্প্রসারণের ফলে এখন প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, যা চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনকে আরো সীমিত করে তুলছে। স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে, যাতে গাজায় কোনো স্থিতিশীল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠতে না পারে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বাড়ছে এবং মানুষের জীবনযাপন আরো অনিরাপদ হয়ে উঠছে। এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত নতুন প্রশাসনিক কাঠামো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গাজার প্রশাসনের জন্য গঠিত কমিটি মাঠপর্যায়ে কাজ করতে পারছে না, ফলে পুনর্গঠন বা নাগরিক সেবা কার্যক্রম এগোচ্ছে না। মানবিক সহায়তা প্রবেশেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন যে পরিমাণ সহায়তা প্রবেশের কথা, বাস্তবে তার একটি ছোট অংশই গাজায় পৌঁছাচ্ছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা থাকায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে প্রশাসনিক কার্যক্রম সীমিত রাখার এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে গাজায় স্বাভাবিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
গাজায় বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট চরমে, বাড়ছে রোগব্যাধি
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলার ফলে বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে চার দিনের ব্যবধানে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত এক প্রকৌশলী ও দুই চালক নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। তারা বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে পানি পৌঁছে দেয়ার কাজ করছিলেন। খবর দ্য গার্ডিয়ানের। স্থানীয় পানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পানি সরবরাহ ও মেরামত কাজে যুক্ত অন্তত ১৯ জন কর্মী নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ হামলায় উত্তর গাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাজারো মানুষের পানির জোগান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ দিকে আন্তর্জাতিক শিশু সংস্থার সহযোগিতায় পানি বহনকারী গাড়ির চালকদের ওপর হামলাও মানবিক কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সাথে সাবান, পরিষ্কারক দ্রব্যসহ স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত উপকরণ প্রবেশে বাধা থাকায় এসব পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
বর্তমানে গাজায় প্রতিদিন একজন মানুষের জন্য গড়ে মাত্র সাত লিটার পানযোগ্য পানি এবং ১৬ লিটার গৃহস্থালি পানি পাওয়া যাচ্ছে, যা ন্যূনতম চাহিদার অনেক নিচে। চিকিৎসকদের মতে, বিশুদ্ধ পানির অভাব ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রোগ সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। নারী ও শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন সংক্রমণ বাড়ছে, ক্ষতস্থানে পচন দেখা দিচ্ছে, এমনকি মানসিক সমস্যাও বাড়ছে। পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অবকাঠামো ধ্বংস, জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনা থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে নতুনভাবে ব্যবস্থা চালু রাখতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত পর্যাপ্ত সহায়তা ও অবকাঠামো পুনর্গঠন না হলে গাজায় পানির সঙ্কট বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
ডিজিটাল অর্থপ্রদানের বিঘেœ নিত্যজীবন অচল
গাজা উপত্যকায় প্রযুক্তিনির্ভর অর্থ লেনদেন ব্যবস্থায় সামান্য ত্রুটি বড় সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় একটি মোবাইল অর্থসেবা ব্যবস্থায় হঠাৎ বিঘœ ঘটায় কয়েক ঘণ্টার জন্য কেনাকাটা, যাতায়াত ও দৈনন্দিন লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। আনাদোলু জানায়, দীর্ঘ দিন ধরে নগদ অর্থের তীব্র সঙ্কট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে এই ধরনের মোবাইল অর্থপ্রদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ইসরাইলি অবরোধের কারণে নতুন কাগুজে মুদ্রা প্রবেশ না করায় পুরনো নোটও অনেক ক্ষেত্রে অচল হয়ে পড়েছে। তবে এই ব্যবস্থা নিজেই অনিশ্চিত। বিদ্যুৎঘাটতি, দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ ও নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে যেকোনো সময় লেনদেন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনায় বহু মানুষ বাজার থেকে খাবার কিনতে না পেরে ফিরে গেছে, আবার কেউ কেউ যাতায়াতের ভাড়া দিতে না পেরে পথে আটকে পড়ে।
পশ্চিমতীরে সড়ক অবরোধ, যানবাহনে হামলা
অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা একটি প্রধান সড়ক অবরোধ করে ফিলিস্তিনিদের যানবাহনে হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে আনাদোলু জানায়, রামাল্লাহর পূর্বে একটি শহরের প্রবেশপথ বন্ধ করে গাড়িতে পাথর নিক্ষেপ করা হয়, এতে কয়েকটি গাড়ির জানালা ভেঙে যায়।
একই ধরনের আরেকটি ঘটনায় আল-বিরেহ শহরের প্রবেশমুখেও যানবাহনে হামলা চালানো হয়। যদিও এসব ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা যায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে বসতি স্থাপনকারী ও ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় বহু ফিলিস্তিনি নিহত ও আহত হয়েছে। শুধু মার্চ মাসেই শত শত হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
ইতালি থেকে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার নতুন যাত্রা
ইতালির সিসিলি দ্বীপ থেকে রোববার শুরু হয়েছে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র ২০২৬ সালের বসন্তকালীন মিশন। আবারো উত্তাল সমুদ্র চিরে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার দিকে এগোচ্ছে মানবিকতার এক বিশাল নৌবহর। ইসরাইল সরকারের দীর্ঘ দিনের কঠোর অবরোধ ভেঙে গাজার সাধারণ মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দেয়াই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। খবর মিডলইস্ট মনিটরের।
গত ১২ এপ্রিল বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করা এই বহরটি সিসিলিতে এসে সাথে আরো কিছু শক্তি যোগ করেছে। সিসিলির সিরাকিউজ এবং অগাস্টা শহর থেকে ইতালীয় সক্রিয় কর্মী এবং বেশ কিছু নৌকা এই বহরে যোগ দেয়। অগাস্টা ইয়ট হারবারে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার সময় নৌকার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৫টিতে। একটি সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক পরিকল্পনা মেনে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি চিরে নৌকাগুলো এখন গাজার পথে। মাঝসমুদ্রে গ্রিনপিসের একটি জাহাজ এই নাগরিক উদ্যোগে সংহতি জানিয়ে বহরে যোগ দিলে সবার মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রার সময় ফিলিস্তিনের সমর্থনে স্লোগান আর মশাল জ্বালিয়ে বিদায় জানানো হয় কর্মীদের। চোখেমুখে অনিশ্চয়তা থাকলেও সবার কণ্ঠে ছিল গাজার উপকূলে পৌঁছানোর একরোখা সংকল্প।
মিডলইস্ট মনিটরের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ আহমেদ বলেছেন, গাজা অবরোধের এই জটিল রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। ‘ফ্লোটিলা’ বা এই নৌ-অভিযান মূলত বিশ্ববিবেকের এক প্রতিবাদী প্রতীক। ২০০৭ সাল থেকে ইসরাইল যখন গাজাকে চার পাশ থেকে আটকে দেয়, তখন থেকেই আন্তর্জাতিক অ্যাক্টিভিস্টরা সমুদ্রপথে এই অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করে আসছেন। এই ‘ফ্লোটিলা’ শব্দটির ইতিহাসও বেশ পুরনো। এটি স্প্যানিশ শব্দ ‘ফ্লোটা’ থেকে এসেছে, যার মানে ছোট নৌবহর। মূলত সামরিক বা বিশেষ প্রয়োজনে ছোট ছোট জাহাজের দলবদ্ধ যাত্রাকেই ফ্লোটিলা বলা হয়। বর্তমান সময়ে এটি কেবল ত্রাণবাহী জাহাজ নয়; বরং এটি ইসরাইল সরকারের অমানবিক অবরোধের বিরুদ্ধে এক বিশাল রাজনৈতিক ঢাল। যারা এই নৌকায় আছেন, তারা জানেন গাজার সমুদ্রসীমায় পৌঁছানো কতটা বিপজ্জনক, তবুও তারা যাচ্ছেন কেবল এই বার্তা দিতে যে, গাজা একা নয়। ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এটি একটি বৈশ্বিক প্রতিরোধ। এই মিশনটি ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র জন্য দ্বিতীয় দফার প্রচেষ্টা। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা একবার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু অক্টোবরে আন্তর্জাতিক নৌসীমায় থাকাকালীন ইসরাইলি বাহিনী সেই বহরের ওপর হামলা চালায় এবং শত শত কর্মীকে আটক করে নিয়ে যায়। বন্দীদেরকে হেনস্তাও করে ইসরাইলি নিরাপত্তাবাহিনী।



