আবদুল হাই শিকদার
সন্ধ্যার পর গুলিস্তান থেকে বেবিট্যাক্সি করে হাজির হলাম ভাবীর গুলশানের বাসার সুন্দর করে সাজানো আলো ঝলমল ড্রইংরুমে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফরিদা হোসেন এলেন। আমি তার দিকে তাকিয়ে, বলতে দ্বিধা নেই অবাক হয়েছিলাম। অবাক হওয়ার কারণও আছে। তো যে কথা বলছিলাম। ফরিদা ভাবী আমাকে অবাক করে কক্ষে আসন নিলেন। পরিচ্ছন্ন কিন্তু অত্যন্ত সাদামাটা একটি তাঁতের শাড়ি ভাবীর পরনে। আবহমান বাংলার মায়েদের যে কল্যাণময়ী রূপ এবং কথা আমরা জানি, ঠিক সেই রকম একটা মমতাময়ী প্রতিমূর্তি মুহূর্তে আমার মধ্যে নির্মাণ হয়ে যায়। যেন কতকাল ধরে এই মানুষটির সাথে আমার জানাশোনা।
দাম্ভিকতার ন্যূনতম লেশমাত্র নেই। আড়ম্বরের বালাই নেই। বাংলাদেশের প্রকৃতির মতো অনাবিল কিন্তু প্রাণের সচ্ছলতা আচরণে, উচ্চারণে। স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর প্রতিটি শব্দকে দান করে আলাদা মর্যাদা। সব মিলিয়ে বিতরণ করে এক নির্মল সৌন্দর্যের বিভূতি। আর চার দিকে ছড়িয়ে পড়ে ব্যক্তিত্বের আভা কিন্তু কোথাও কৃত্রিমতার ছায়ামাত্র নেই। আমি ভেতরে ভেতরে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
ভাবী অনেকটা সময় নিয়ে নেড়ে নেড়ে দেখলেন প্রচ্ছদটা। সময়টা ১৯৮৪-৮৫ সালের মাঝামাঝি। তার পর আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। বললেন, আপনারা পত্রিকার জগতের মানুষ। আপনাদের কেমন লাগছে বলুন? আমি দেখেটেখে বললাম, ভাবী আপনার গল্পগুলোর যে বিষয়বস্তু এবং বুননের নৈপুণ্য তার কিছুটা ধারণ করেছে এই প্রচ্ছদ।
ভাবী বললেন, আমারও তাই ধারণা।
প্রচ্ছদ পাস হয়ে গেল। কিন্তু ভাবী আমাদের না খাইয়ে ছাড়বেন না।
সেই শুরু। তার পর কতবার কতকাজে অকাজে যে ভাবীর মুখোমুখি হয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই। পেশাগত জীবনে হয়তো বছরের পর বছর দূরে থেকেছি, আমরা হয়তো ভুলেই গেছি অনেক কিছু। কিন্তু ভাবী কোনো কিছু ভোলেন না। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে ঠিকই ভাবীর ডাক পেলাম। বাসায় হয়তো বিদেশী মেহমান এসেছে, ভাবীর ডাক পেলাম। হয়তো অবিনশ্বরের কোনো আয়োজন, ভাবীর দাওয়াতপত্র এসে হাজির। কোনো আবৃত্তি কিংবা আন্তর্জাতিক পেনের অনুষ্ঠান, ভাবীর টেলিফোন, শিকদার আবিদাকে সাথে নিয়ে চলে আসবেন সময়মতো।
মায়ের মতো গভীর মমতা নিয়ে তার জীবনের চার দিকে শিল্পের এক ভুবন নির্মাণ করেছেন তিনি। সেই ভুবনের পরতে পরতে তার স্বপ্ন। নিজের সংসার ও সন্তানদের যে অপরিসীম দায়িত্ব নিয়ে বড় করে তুলেছেন, সেই একই রকম মঙ্গল কামনা তার শিল্পের ভুবনের জন্য। নিজের সংসার ও সাধনার মধ্যে তিনি কখনো কোনো পার্থক্য করেন না। করেন না বলেই আমাদের মতো খানিকটা উড়নচণ্ডী লোকদেরকেও তিনি অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন মায়ের আদর।
কত স্মৃতি কত কথা। কোনটা রেখে কোনটা বলি। ‘এখন’ তখন ডুবতে বসেছে। উপদেষ্টা সম্পাদক কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ তখন চলে গেছেন শিল্পতরুতে। বিজ্ঞাপন ম্যানেজার বিজ্ঞাপনের টাকা মেরে গা ঢাকা দিয়েছেন। জাকি ভাই বললেন, ‘তোমরা নিজেদের উপার্জন দিয়ে চলার চেষ্টা করো।’ আমি তখন দিশেহারা। পেশা এবং নেশা দুটোই তখন ‘এখন’কে ঘিরে। কোথায় যাব কি করব ঠাহর করতে পারি না। সেই দুঃসময়ে ভাবী এগিয়ে এলেন ‘উদ্ধার’ করতে। ‘এখন’ এর হাল ধরলেন।
ফরিদা ভাবীর কোন গুণের কথা বলব। সেই সময়কার পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শ্রমিকনেতা, যিনি ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশনের (আইএলও) এশিয়ার একমাত্র সদস্য মরহুম ফয়েজ আহমদের মেয়ে তিনি। গল্পগ্রন্থ ‘অজন্তা’ বেরিয়েছে সেই ১৯৬৫-তে। সত্তরের দশকে তার নাটক ‘তুষার কন্যা’ নিয়ে রীতিমতো আলোড়ন চার দিকে। ‘তেলাদার তেলাতঙ্ক’ পড়ে আমরা হেসে খুন। উপন্যাস, গল্প, নাটক, শিশুসাহিত্য, সব ক্ষেত্রে ক্রমাগত রেখে যাচ্ছেন প্রতিভার ছাপ। আবৃত্তি ও নাটক পরিচালনার বেলায়ও দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা। শিল্পপতি রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের মতো স্বামী তো সম্ভবত স্রষ্টার পক্ষ থেকে তার জন্য একটি আশীর্বাদ।
আমাদের প্রকাশনা জগতের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার জন্য তিনি গড়ে তুলেছেন ‘আঞ্জুম প্রকাশনী’। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে অর্জন করেছে সুনাম। এরই ফাঁকে আশির দশকের শেষে হাত দিলেন ‘রেনেসাঁ’ সৃষ্টিতে। রেনেসাঁ নামটির মধ্যে যেমন নবজাগরণের ধ্বনি, তেমনই ভাবীর পরিকল্পনার মধ্যেও ছিল অভিনবত্ব। পত্রিকা, বইপত্র প্রকাশ থেকে শুরু করে বাগান পরিচর্যা, নার্সারি, শিশুর মানস গঠন সামগ্রী নির্মাণসহ অনেক কিছু ছিল তার চিন্তায়। রেনেসাঁ সত্যিকার অর্থেই এক অগ্রগামী চিন্তার বাহন হয়ে উঠেছিল।
ভাবী যখন রেনেসাঁর কাজে হাত দেন, তখন আমি প্রায় বেকার। হোন্ডা কোম্পানির একটি ফিফটি সিসি মোটরসাইকেল নিয়ে সারা দিন এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াই। ভাবীর চোখে পড়েছিল আমার এই ছন্নছাড়া জীবন।
একদিন বললেন, ‘রেনেসাঁর জন্য আমার একজন বিশ্বস্ত এবং দক্ষ সহকারী দরকার। কাকে নেয়া যায়।’
আমি এর ওর নাম বলি। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার কথা বলি।
কিন্তু ভাবীর সায় মেলে না। শেষে বললেন, আবিদা কী করে।
আবিদা মানে আমার স্ত্রী।
বললাম ‘তেমন কিছু নয়’।
বললেন, ‘ওকেই কাজে লাগাই’।
ভাবীর বলার ধরন দেখে ধরে নিলাম ভাবী এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন এবং আরো যে জিনিসটি বুঝলাম, এই সহকারী নেয়াটা আসলে আমাকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেয়ার জন্য। অন্য যে কাউকে নিতে পারতেন তিনি। কিন্তু তা না করে আবিদাকে পছন্দ করা যে নিতান্তই গভীর মমতা থেকে উৎসারিত, তা বুঝতে বাকি রইল না। আমার মন ভরে গেল কৃতজ্ঞতায়।
মনীষী সৈয়দ আলী আহসানের প্রতি ভাবীর যে শ্রদ্ধাবোধ আমি দেখেছি তা এককথায় অতুলনীয়। ভাবীকে আমিই নিয়ে গিয়েছিলাম স্যারের বাসায়। প্রথম দর্শনেই দু’জন পিতা ও কন্যা হয়ে গেলেন। তাদের দু’জনের মধ্যে এই পবিত্র সম্পর্ক স্যারের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল। সে সময় দেখেছি স্যারের কী দরকার, বিদেশ থেকে কোন ওষুধটা আনতে হবে, স্যার কী কী খেতে পছন্দ করেন-সেগুলো প্রতিনিয়ত নীরবে নিভৃতে, কোনো কিছু প্রাপ্তির আশা না করেই সরবরাহ করে গেছেন ফরিদা ভাবী। স্যারের জীবনের শেষ দিনগুলো ফরিদা ভাবীর সেবার পরশে সতেজ হয়ে উঠেছিল।
সাহিত্য পত্রিকার বিষয়টি ভাবীর মধ্যে সবসময় কাজ করেছে। সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করা, লেখক কবিদের জন্য কিছু করাকে তিনি তার শিল্পসাধনার অন্যতম প্রধান অঙ্গ মনে করেছেন সর্বদা। এ জন্য ‘এখন’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভাবী চাইলেন সুন্দর স্বনির্ভর এবং রুচিশীল একটি সাহিত্য পত্রিকা। ভাবীর এই স্বপ্ন ও পরিকল্পনারই বাস্তবরূপ আজকের ‘অবিনশ্বর’। অবিনশ্বরের দেহ, আত্মা, ভেতর, বাহির সব কিছুই ফরিদা ভাবীর চেতনার রঙে রাঙানো। আমার এখানে গৌরবের আছে দু’টি দিক আছে ভাবীর কাছে দু’টি স্বপ্ন। ‘অবিনশ্বর’ নামটি আমিই প্রস্তাব করেছিলাম। আরো দু’-একটি নাম বলেছিলাম। তবে ভাবী বেছে নিয়েছিলেন ‘অবিনশ্বর’। আর অবিনশ্বরের প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশনার দায়িত্ব আমাকেই দিয়েছিলেন তিনি। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন আতিক মামুন।
আমি মমতার কথা বলেছি পাশাপাশি এ কথা না বললেই নয়, অসম্ভব সহানুভূতিশীল সংবেদনশীল একটি মনও আছে এই মহীয়সী মহিলার। তার সেই সব মানবিক গুণাবলির ছায়া, বলতে দ্বিধা নেই, না চাইতেই অনেক পেয়েছি আমি। এ যে আমার কত বড় সৌভাগ্য বলে বোঝাতে পারব না।
দেশে কিংবা দেশের বাইরে কোথাও হয়তো যাব কিংবা বিশেষ কোনো কারণে হয়তো কিছু টাকাকড়ির দরকার, ভাবীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই হলো-কোনো কথাই বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন হয় না। ভাবী ঠিক বুঝে ফেলেন। হয়তো সামান্য একটু হেসে বলেন, ‘একটা ফোন তো করে আসবেন’। ব্যাস এটুকুই। সমাধান সুনিশ্চিত।
আমার কিছু বলার নেই। আমার শুধু একটি কথাই বলার, এছাড়া অন্য কোনো শিরোনামের চিন্তাটাই আমার মাথায় আসেনি। ফরিদা ভাবীকে যারা জানেন, যারা চেনেন, যারা তার কাছে এসেছেন-তারা নিশ্চয়ই আমার সাথে একমত হবেন, তিনি সত্যি এক ব্যতিক্রম। ঢাকার নাগরিক নখরামো এবং কোলাহলের মধ্যেও তিনি আমাদের চিরকালের বাংলাদেশ। তাই তো কোনো কোলাহল, কোনো কৃত্রিমতা তাকে তার পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার ধ্যানের জায়নামাজ থেকে সরাতে পারে না। তিনি নিশঙ্কচিত্তে আজও ক্রমাগত ফুটিয়ে যাচ্ছেন কদমফুল।
এমন একজন ভাবীকে জননীর সম্মান না জানালে মানুষ হিসেবে নিজেকে খুব ছোট মনে হবে।



