- ৩০ দিনের মধ্যে নতুন কমিশন নিয়োগের বাধ্যবাধকতা : ৪০ দিনেও হয়নি সার্চ কমিটি
- ভিআইপির দুর্নীতির অনুসন্ধান, তদন্তসহ কয়েক হাজার মামলার কার্যক্রম বন্ধ
অভিভাবক শূন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ৪০ দিন পার হলেও দুদকের নতুন চেয়ারম্যানসহ কমিশন গঠনে করা হয়নি সার্চ কমিটি। ফলে দুর্নীতি দমনে একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
গত ৩ মার্চ আব্দুল মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর ৪০ দিন পেরিয়ে গেছে। তবে এখনো গঠিত হয়নি নতুন সার্চ কমিটি। যদিও আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার দুই সপ্তাহর মাথায় ৩ মার্চ মেয়াদের আগেই পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেনসহ দুই কমিশনার। এর পর থেকে নেতৃত্বশূন্য স্বাধীন সংস্থাটি। এতে থমকে গেছে ভিভিআইপি ও ভিআইপির দুর্নীতির অনুসন্ধান, তদন্তসহ কয়েক হাজার মামলার কার্যক্রম।
এ অবস্থায় কবে কিভাবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার, এই অপেক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। কারা হচ্ছেন দুদকের নতুন অভিভাবক, এ নিয়ে চলছে আলোচনা।
দুদকের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন, কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করায় নতুন কমিশন গঠনের তৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে শিগগিরই কমিশন গঠন নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে।
ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারে পদক্ষেপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) ২০২৫ অধ্যাদেশ জারি করে তৎকালীন সরকার।
এ দিকে কমিশনের অনুপস্থিতিতে নতুন মামলা, চার্জশিট, আসামি গ্রেফতার কিংবা দুর্নীতিবাজদের সম্পদ ক্রোকের মতো নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীরা। এক দিকে আইনি জটিলতা আর অন্য দিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় স্বাধীন এই সংস্থাটি এখন কার্যত অচল হয়ে আছে।
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নানামুখী জটিলতায় দুদকের কমিশন গঠনের ধারাবাহিকতায় বারবার ছন্দপতন ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে, সাতটি কমিশনের মধ্যে মাত্র তিনটি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশনকে মেয়াদের আগেই বিদায় নিতে হয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, মো: বদিউজ্জামান ও ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনগুলো তাদের নির্ধারিত সময় পূর্ণ করতে পারলেও সেই সৌভাগ্য হয়নি বাকিদের।
বিচারপতি সুলতান হোসেন খান, সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং সর্বশেষ গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করা ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান, অনুসন্ধান ও তদন্তে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছে মোমেন কমিশন। এই অল্প সময়ে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫ হাজার অভিযোগের বিপরীতে মামলা ও চার্জশিটে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দুদকের জালে ফেঁসেছেন। যার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার, ওই সরকারের প্রায় সব মন্ত্রী, সাবেক আমলা ও দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিরা রয়েছেন। একই সময়ে দেশে ও বিদেশে অর্থপাচারকারী ও ঋণখেলাপিদের প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান থাকলেও কমিশন না থাকায় বর্তমানে সম্পদ ক্রোক, নতুন মামলা, আসামি গ্রেফতার ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার কাজ বন্ধ রয়েছে। কমিশন না থাকার সুযোগ নিচ্ছেন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা। নতুন কোনো অনুসন্ধান শুরু করাও সম্ভব হচ্ছে না, ফলে দুদকে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে।
দুদকের পরিসংখ্যান ও ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে স্বাধীন এই সংস্থাটি।
২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। কিন্তু তিন বছর পার হতেই ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি পদত্যাগ করেন। মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে ২২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব পান সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী। দুই বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ২০০৯ সালের ২ এপ্রিল তিনিও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর ওই বছরের ৩০ এপ্রিল দায়িত্ব নেন সাবেক সচিব গোলাম রহমান।
২০২১ সালের ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ। তিনি তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে ’২৪-এর ২৮ অক্টোবর পুরো কমিশনসহ পদত্যাগ করেন।
মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ কমিশনের বিদায়ের প্রায় দেড় মাস পর ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের নতুন কমিশন গঠন করা হয়। পাঁচ বছরের মেয়াদে নিয়োগ পেলেও মাত্র ১৫ মাসের মাথায় আবারও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তাদের পথচলা থামিয়ে দেয়। এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হওয়ার পর ৩ মার্চ চেয়ারম্যান ড. মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন।
মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর ইতোমধ্যে ৪০ দিন পার হয়ে গেলেও নতুন কমিশন গঠনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী, কোনো কমিশনারের পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নিয়োগ দেয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। এমনকি নতুন কমিশন গঠনের প্রাথমিক ধাপ ‘সার্চ কমিটি’ও এখনো গঠন করা হয়নি, যা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতাই এই বিলম্বের মূল কারণ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’ সরাসরি সংসদে অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তার ওপরই এখন নির্ভর করছে দুদকের ভবিষ্যৎ। আর এই সিদ্ধান্তহীনতার কারণে থমকে আছে সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া, যা চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগকে আরো দীর্ঘায়িত করার শঙ্কা তৈরি করেছে।
দুদক আইন অনুযায়ী, অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, মামলা করা, আসামি গ্রেফতার, দুর্নীতিবাজদের সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা কিংবা বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মতো প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কেবল কমিশনের। ফলে এই অভিভাবকহীন অবস্থায় দুদকের সকল অভিযান ও আইনি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এই কমিশন-শূন্যতা কার্যত দুর্নীতিবিরোধী দেশের একমাত্র এই প্রতিষ্ঠানটিকে থমকে রেখেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, দুদক সংস্কার কমিশনের সব সুপারিশ বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে ‘জুলাই সনদে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জুলাই সনদের পাশাপাশি দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব প্রস্তাবে বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে লিখিত সমর্থন জানিয়েছে, সেগুলোর আলোকে অধ্যাদেশটি দ্রুত সংশোধন করে অবিলম্বে সংসদে আইন হিসেবে অনুমোদনের দাবি জানাচ্ছি।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি ‘স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের সুপারিশ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে একমত হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত পর্যায়ে এই বিধানটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেয়া হয়েছে বলে মনে করে টিআইবি।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দুদকের বিভিন্ন অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে ৪৩৯টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেয়া হয়েছিল। ওই সময়ে ২২৭টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) হয়। একই সময়ে ৩২৮টি মামলা ও ৩৪৫টি মামলার চার্জশিট দিয়েছিল দুদক। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে সর্বাধিক ১০০ ও ৭৩টি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হলেও ওই বছরের নভেম্বরে কোনো অনুসন্ধানই হয়নি তৎকালীন মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগের কারণে। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালের নভেম্বরে মামলা, চার্জশিট কিংবা অন্যান্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুদকে জমা পড়া ১৩ হাজার ৮৭৭টি অভিযোগের বিপরীতে আমলযোগ্য ২ হাজার ৫৩৬টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় মোমেন কমিশন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ৫৯৪টি মামলা ও ৪১৩টি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়। একই সময়ে ৪৩২ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করা হয়।
অন্য দিকে, ২০২৫ সালে দুদকের ৩৭০টি আবেদনের বিপরীতে অবৈধভাবে অর্জিত এবং বিদেশে পাচার হওয়া ২৯ হাজার ৩১০ কোটি ১২ লাখ ৭ হাজার ১৫৩ টাকা মূল্যের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধের আদেশ দেন আদালত।
এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ১৭৯টি অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করার পাশাপাশি ১২৩টি মামলা ও ৫৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৯১৩ জন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের ৮৯টি সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারি করা হয়।
তবে ৩ মার্চ মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর থেকে মামলা ও চার্জশিটসহ আইনগত গুরুত্বপূর্ণ সকল সিদ্ধান্ত বন্ধ রয়েছে।



