ইরানে বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় নিহত ৫, আহত ৭০

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
  • নিরপেক্ষ তদন্তের ঘোষণা পেন্টাগনের
  • তেহরানের বহুমাত্রিক আঘাতের হুঁশিয়ারি

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সিরিকের কুহেস্তাক গ্রামে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বিমান হামলায় পাঁচজন নিহত ও অন্তত ৭০ জন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করার কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন। চারজন আন্তর্জাতিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ রয়টার্সের সরবরাহ করা ভিডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছেন, কোনো লক্ষ্যভ্রষ্ট আঘাত বা ছিটকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং সরাসরি শক্তিশালী মার্কিন অস্ত্রের আঘাতেই এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, একের পর এক মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে তারা এবার কৌশলগতভাবে ‘বহুমাত্রিক’ ও ‘অসম’ (অ্যাসিম্যাট্রিক্যাল) প্রভাবে পাল্টা আঘাত হানবে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ মতে, কুহেস্তাক গ্রামে ক্ষয়ক্ষতির ধরন সরাসরি শক্তিশালী মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের আলামত বহন করে, যা কোনোভাবেই ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়।

অন্যদিকে ইরানের সাথে চলমান এই ভয়াবহ সঙ্ঘাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘যুদ্ধ’ বলতে নারাজ মার্কিন প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানান, এই সঙ্ঘাতকে তারা যুদ্ধ মনে করেন না এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া বা যুদ্ধ থামার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা তাদের জানা নেই।

কুহেস্তাক গ্রামে হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকায় জে ডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। আমাদের সামরিক বাহিনী কোনো ভুল করলে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীতে নিজেদের শুধরে নেয়ার চেষ্টা করে।’ তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা কখনো সাধারণ বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানায় না।

কুহেস্তাকে নিহতদের জানাজায় হাজার হাজার শোকাহত মানুষের ঢল নামলে পুরো এলাকা তীব্র ক্ষোভ ও কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা আক্ষেপ করে বলেন, এটি কোনো সামরিক ঘাঁটি ছিল না, একটি আনন্দের অনুষ্ঠানকে এক নিমেষে শ্মশানে পরিণত করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটনের ক্রমাগত আক্রমণ তেহরানের সামরিক কৌশলে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে। ইরানি প্রতিক্রিয়া এখন থেকে আর একমুখী থাকবে না। একই সময়ে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শাখার (বাসিজ) প্রধান হোসেইন তায়েব স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ওয়াশিংটনকে অবশ্যই সমঝোতা স্মারকের শর্ত মেনে চলতে হবে। ইরান নিজে থেকে কখনোই কোনো আলোচনা বা যুদ্ধবিরতির আবেদন জানাবে না এবং ওয়াশিংটনের সামনে নতি স্বীকার করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়া রুখতে তেহরান পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর অবরোধ আরো কঠোর করেছে। বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবাহী অন্তত ৫০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক জাহাজকে ইতোমধ্যেই কালো তালিকাভুক্ত করেছে ইরানি প্রশাসন, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়ে জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সঙ্ঘাত সপ্তম মাসে গড়ালেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা চলছে না। ইরানের সাথে সঙ্ঘাতের প্রসঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট একে ‘যুদ্ধ’ বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দাবি করেন, তাদের মূল সামরিক অভিযান শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মূল মনোযোগ হলো বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজে যেন ইরান কোনো বাধা তৈরি করতে না পারে। ইরানের হামলা বন্ধ না করা পর্যন্ত কোনো আলোচনা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আসন্ন নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই দীর্ঘায়িত সঙ্ঘাত প্রেসিডেন্সিয়াল প্রশাসনের ওপর চরম রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ঊর্ধ্বমুখী দাম এবং মার্কিন জনমতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামায় রিপাবলিকান পার্টির জন্য কংগ্রেসে প্রভাব ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থান করছে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা। সমুদ্রসীমায় কঠোর সামরিক অবরোধ বজায় রাখতে ওয়াশিংটন অন্তত ২০টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রেখেছে, যার জন্য ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য সরাতে হয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরকে। তবে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি সঙ্ঘাতের ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম অস্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে।