ঢাকা মেডিক্যালে উপচেপড়া ডেঙ্গু রোগী একটি অংশ ঢাকার বাইরের

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুর রোগী উপচে পড়ছে। একটি অংশ ঢাকার বাইরে থেকে আসা। এই হাসপাতালে তিনটি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু চিকিৎসা চলমান কিন্তু তাতেও রোগী সঙ্কুলান হচ্ছে না। প্রতিদিনই নতুন বেড বাড়াতে হচ্ছে। মেডিসিন বিভাগের ২০২, ৫০২ ও ৭০৩ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডের বাইরে লিফটের সামনে ও পেছনে বেড স্থাপন করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এখানে চিকিৎসা নিতে আসার রোগী একটি বড় অংশ ঢাকার বাইরে থেকে আসছে এবং ঢাকার বাইরে থেকে আসা প্রতিটি রোগীই আসে জটিলতা নিয়ে। এ ব্যাপারে মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও রেজিস্ট্রার ডা: সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, ‘ঢাকার বাইরে থেকে এখানে আসা মানেই ওই রোগীর জটিলতা বেশি। ডেঙ্গুর কারণে একাধিক সমস্যা নিয়ে আসেন তারা। তারা আসেন এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম নিয়ে। এ ধরনের রোগীদের ব্রেইন, লিভার, কিডনি আকর্যকর হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে এসব জটিলতার চিকিৎসা করতে পারে না বলে হাসপাতাল থেকেই ঢাকায় বিশেষ করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। ৪০২ নম্বর ওয়ার্ডের বাইরে মাগুরা থেকে এসেছেন আবদুল মতিন (৩৫)। তার চোখ দুইটা ছিল হলুদ, পা ফোলা টসটসে, শরীরটাও ফোলা। কথা বলতেও পারছিলেন না। তিনি স্বাভাবিকভাবে প্রস্রাব করতে পারছেন না। ক্যাথেটারের মাধ্যমে ইউরিনাল ব্যাগে প্রস্রাব এসে জমা হচ্ছিল। তার ভাই আব্দুল হালিম জানিয়েছেন, আবদুল মতিনের লিভারেও সমস্যা, ঠিকমতো কাজ করছে না। প্রস্রাব আটকে যাওয়ার কারণে ডাক্তার ক্যাথেটার লাগিয়ে দেয়ায় অনবরত পড়ছে। বোতল থেকে পানি পান করাতে করাতে আবদুল হালিম বলছিলেন, মাগুরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা হচ্ছিল না বলে তারা সময় ব্যয় না করে এখানে চলে এসেছেন।

চাঁদপুর থেকে এসেছে তৌহিদুল ইসলাম (১৬)। চাঁদপুর হাসপাতালের চিকিৎসায় সুস্থ হচ্ছিল না। ৯ সেপ্টেম্বর (গত বুধবার) এখানে এসে ভর্তি হয়েছে বলে জানান তার মা। এ প্রতিবেদকের সাথে কথার বলার সময় তৌহিদুল তার ব্যাগ গুছাচ্ছিল। তার মা জানান, ‘তাদের রিলিজ দেয়া হয়েছে, চলে যেতে হবে।’ ‘সুস্থ হয়ে গেছে?’ প্রশ্ন করা হলে তৌহিদুলের মা জানান, ‘এখনো দুর্বলতা আছে, তবে ডাক্তার চেলে যেতে বলেছেন, তাই চলে যাচ্ছি। আশা করি, বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিলে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে।’

নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছেন মো: আব্বাস উদ্দিন। তিনি গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভর্তি আছেন। সুস্থ হওয়ার পথে। তারও লিভারে সমস্যা হয়েছিল। দাঁতের ফাঁক দিয়ে রক্ত ঝরছিল, শরীর ফুলে গিয়েছিল। তবে এখন অনেকটাই সুস্থ।

আগে ডেঙ্গু জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের দেখতে গেলেই দেখা যেত রক্ত নিতে এবং রক্ত দিতে রোগীর অভিভাবকদের দৌড়াদৌড়ি করতে। সহকারী অধ্যাপক ডা: সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় আগের চেয়ে পরিবর্তন এসেছে। এ ব্যাপারে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় এখন আমরা প্লাটিলেটের চেয়ে বেশি চিন্তা ফ্লইড ব্যবস্থাপনা নিয়ে। ডেঙ্গু জটিলতায় রক্তের জলীয় অংশ সরে যাচ্ছে এবং তা শরীরের অন্য কোথাও গিয়ে জমা হচ্ছে। এটা হতে পারে ত্বকের নিচে অথবা বুকের মধ্যে অথবা পায়ে গিয়ে জমা হচ্ছে অথবা অন্য কোথাও গিয়ে জমা হচ্ছে। আমরা পরীক্ষা করে দেখছি জলীয় অংশ বের হচ্ছে কি না এবং তা পূরণ করে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে ফ্লুইড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। রক্তের জলীয় অংশ রক্ত থেকে সরে গেলে রোগীর রক্তচাপ কমে যায়, প্লাটিলেটও কমে কিন্তু তা নিয়ে আমরা তেমন কোনো চিন্তা করি না। কারণ, অন্যান্য জটিলতা দূর হয়ে গেলে প্লাটিলেটের পরিমাণও বেড়ে যায়। আমরা এখন রোগীর রক্ত দেয়ার প্রয়োজন পড়লে শুধু প্লাটিলেট না সম্পূর্ণ রক্ত দেয়ার কথা চিন্তা করি। কারণ, সম্পূর্ণ রক্ত দিলে রোগীর অনেক বেশি কাজে আসে, প্লাটিলেটের সাথে রক্তের অন্যান্যও অংশও রোগী পেয়ে যান। কখন একজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে আসবেন ভর্তি হতে, এই প্রশ্নের উত্তরে ডা: সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, কিছু ডেঞ্জার সাইন (সতর্কতামূলক চিহ্ন) আছে সেগুলো রোগীর নজরে পড়লেই হাসপাতালে এসে ভর্তি হতে হবে। সেগুলো হলো- জ্বর অবস্থায় বিরতি ছাড়া পেটে ব্যথা হলে, পেট ফুলে গেলে, বমি হলে, শ্বাসকষ্ট হলে। একই সাথে রক্তের প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে গেলে (এটা পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারা যাবে, বাকিগুলো রোগী দেখতে পারবেন ও অনুভব করতে পারবেন)। তিনি বলেন, এসব চিহ্ন দেখলে অথবা বুঝতে পারলেই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। তবে জ¦র হলে অথবা ডেঙ্গু শনাক্ত হলেই প্রথম দিকে ডাক্তার দেখাতে পারলে জটিলতা কম হবে, রোগীর দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ডা: সাজ্জাদ মাহমুদ আরো বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জ্বর কমে গেলে একেবারে সুস্থ হয়ে গেছেন তা ভাবা উচিত নয়, বরং অনেক সময় জ্বর কমে যাওয়ার পরই বিপদটা আসে। সে জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।