নিজস্ব প্রতিবেদক
অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দখল, চাঁদাবাজি, শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রম ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহের ভালুকা বিএনপিতে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
স্থানীয়রা জানান, শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, বনভূমির জবর দখল, চাঁদাবাজি ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে ভালুকা। ফলে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে ব্যবসায়ীরা।
অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর নির্দেশে এখন ভালুকার সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না দলীয় নেতাকর্মী থেকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষও।
সূত্রমতে, ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়ে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে বাচ্চুুকে গত ১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কৃত অপরাধের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আবেদন করার প্রেক্ষিতে দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক উক্ত বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তার প্রাথমিক সদস্যপদ ফিরিয়ে দেয়া হয়। এমপি হওয়ার পর গত ১৮ জুলাই আবার তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন বাচ্চু। অপর দিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন বিএনপির আরেক নেতা মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম। তিনি ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, ভালুকা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ছিলেন। তার অভিযোগ, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পতিত আ’লীগের সাথে আঁতাত, প্রশাসনকে নগ্নভাবে ব্যবহার, ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখানো, ভোট কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টদেরকে বের করে দেয়া ও প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে সিল দিয়ে জোর করে জয় ছিনিয়ে নেয় বাচ্চু।
প্রতিপক্ষ দলীয় নেতাকর্মীসহ অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এমপি নির্বচিত হওয়ার পর বাচ্চুর অনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন বাচ্চুর লোকজন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঝুট ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য হাতিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠে বাচ্চু ও তার লোকজন।
জানা যায়, উপজেলার জামিরদিয়া এলাকায় এসকিউ গ্রুপের কালার মাস্টার কারখানাটি মোর্শেদ আলমের পারিবারিক ও তার ক্রয়কৃত জমিতে গড়ে ওঠে। সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এমপি বাচ্চুর নির্দেশে তার লোকজন মোর্শেদের ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৬ মার্চ মোর্শেদ আলম কারখানা থেকে ঝুট বের করতে গেলে বাচ্চুর নির্দেশে তার লোকজন বাধা প্রদান করেন। উল্টো ইব্রাহিম খলিল নামের একজনকে বাদি সাজিয়ে বাচ্চুর ক্ষমতার দাপটে মোর্শেদ আলমসহ বিএনপির ৫০ জন নেতাকর্মীকে আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। স্থানীয় নারিশ ফ্যাক্টরির ঝুট ব্যবসা নিয়ে বাচ্চুর সমর্থক খোকা মিয়া ও তার ছেলে তোফায়েল আহমেদ রানার মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্র করে অপর একটি মামলায়ও বাচ্চুর নির্দেশে মোর্শেদ আলমসহ তার অনুসারী প্রায় ৮০-৯০ জন নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়।
মোর্শেদ আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, এমপি নির্বাচন করার কারণে মিথ্যা মামলায় আসামি করে তিনিসহ তার কর্মী-সমর্থকদের হয়রানি করা হচ্ছে। এমপি বাচ্চুর নির্দেশে তার পোষ্য লোকজন তার ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দিয়ে আসছে। দলীয় নেতা কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন যাপন করছেন। তিনি বলেন, অবস্থা এমন যে, বিএনপির লোকজনই বাড়ি-ঘরে থাকতে পারছেন না। ভালুকায় বাচ্চু এমপির চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ভালুকা পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ৪৪ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতি করে আমরা এখন আ’লীগ আমলের চেয়ে খারাপ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। বর্তমান এমপি বাচ্চু ও তার সমর্থিত ব্যক্তিদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ট।
ভালুকা উপজেলা বিএনপি যুগ্ম আহ্বায়ক রুহুল আমীন বলেন, এমপি বাচ্চুর লোকজন বিএনপিকে দুই-তিন গ্রুপে বিভক্ত করে ফেলেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাচ্চু এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি যুবলীগ নেতা খলিলুর রহমান মাসুদ ও আ’লীগ নেতা মতিউর রহমান মতি মেম্বার ও মো: সোহাগ মিয়ার নেতৃত্বে একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন। বাচ্চুর প্রতিনিধি হিসেবে হবিরবাড়ী এলাকার মিলকারখানার ঝুট ব্যবসা ও চাঁদাবাজি এরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। এরাই জামিরদিয়ায় অবস্থিত এনভয় টেক্সাইল মিলের ফটকের সামনে থেকে একটি ট্রাক ছিনতাই করে। এ ছাড়া এরা ফ্যাক্টরি থেকে ঝুট বের না করার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন। নতুন নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালু, খোয়া, স্টোন চিপসহ অন্যান্য সামগ্রী বহনকারী গাড়ি প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির এক শীর্ষস্থানীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভালুকায় বিএনপিপন্থী মালিকদের ফ্যাক্টরি থেকে এমপি বাচ্চু চাঁদাবাজি করেছে। পরে সেসব মালিকরা স্থানীয়ভাবে সুরাহা না পেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এসব বিষয়ে স্থানীয় বিএনপির অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীরা এখন লজ্জায় নিজেদের আড়াল করে রাখেন।
বিএনপির একাধিক নেতা নয়া দিগন্তকে বলেন, এমপি বাচ্চুর কর্মকাণ্ডে এক দিকে সাধারণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। অপর দিকে বিএনপি ও সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়েছে। তারা বিশ্বাস করেন দলের চেয়ারম্যান ও সরকারপ্রধান বিষয়টি আমলে নিবেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এমপি ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চু ও তার আপন ভাই নাজিমুদ্দিন উকিলের পরিবার এবং তার আপন বোন জামাই সাইদুলের বিরুদ্ধে বন বিভাগের কোটি কোটি টাকা মূল্যের প্রায় সাড়ে ৫৭ একর (১৭২.৫০ বিঘা) জমি অবৈধভাবে দখল করে ভোগ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। উপজেলার তিনটি মৌজায় ছড়িয়ে রয়েছে এই বিশাল অবৈধ সাম্রাজ্য। এর মধ্যে হবিরবাড়ী মৌজায় মোট ৩৭ একর, এর মধ্যে ১৯ নং দাগে ৭ একর, ২৭৫ নং দাগে ১৪ একর, ৪১৩ নং দাগে ১৬ একর। মেহেরাবাড়ী মৌজায় রয়েছে ১৮.৫০ একর। এর মধ্যে ১২৭ নং দাগে ৪.৫০ একর, ১৪৫ ও ১৫০ নং দাগে ৬ একর, ১৬৮ নং দাগে ৫ একর, ১০৯ নং দাগে ৩ একর। এ ছাড়া পাড়াগঁাঁও মৌজায় মোট ২ একর বনভূমি দখলে রয়েছে। এর মধ্যে ২২৭ ও ২৯০ নং দাগে ২ একর।
এ ছাড়া বাঘসাতরা মোড়ে (ভরাডোবা) চায়না কোম্পানির সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিতব্য একটি প্রতিষ্ঠানের বালু ভরাট থেকে চাঁদা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থাণীয় এমপির বিরুদ্ধে। বলা হচ্ছে, ২ কোটি ঘনফুট বালু দিয়ে ভরাট করা এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিফুট তিন টাকা হিসেবে ছয় কোটি টাকা নিচ্ছেন এমপি নিজেই।
জানতে চাইলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, তিনি বা তার পরিবারের কোনো সদস্য ঝুট ব্যবসার সাথে জড়িত নয়। বিএনপি নেতা মোর্শেদ আলম ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে বলেন, ওই মামলাগুলোতে তার কোনো ইন্ধন নেই। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত রেষারেষি। এনভয় টেক্সটাইলসের ট্রাক ছিনতাই প্রসঙ্গে এমপি বাচ্চু জানান, ঘটনার সময় তিনি সংসদে ছিলেন। খবর পেয়ে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় এক ঘণ্টার মধ্যে ট্রাকটি উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন। চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল, তা ভিত্তিহীন দাবি করে। বাচ্চু বলেন, কোনো কারখানার মালিক এখনো আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেনি। বনভূমি দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, আমার দখলে থাকলে বন বিভাগ মামলা করতে পারে। বালু ভরাট বিষয়ে তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠানটি সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাইয়ের। এখান থেকে চাঁদা নেয়ার অভিযোগ খুবই হাস্যকর। তিনি বলেন, কেউ যদি আমার বা আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল এসব প্রমাণ করতে পারে, তাহলে দল যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটি মাথা পেতে নেব। তিনি বলেন, ভালুকা এখন অতীতের থেকে হাজার গুণ নিরাপদ ও শান্ত। কেউ বলতে পারবে না এখানের এমপি হিসেবে আমি কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছেন। দলের ভেতরে বা বাইরে যাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠবে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।



