দ্বিতীয় ধাপের শুরুতেই শেষ হচ্ছে শিক্ষাজীবন

মূলত উচ্চশিক্ষার গোড়া পত্তন হয় এসএসসি পাসের পরেই। কিন্তু তথ্য উপাত্ত বলছে এসএসসির পর কলেজে ভর্তি হলেও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারছেন না। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার ব্যয় এবং পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরি লাভের সীমিত সুযোগের কারণেই এসএসসি পাসের পর লেখাপড়ায় আগ্রহী হন না শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক উভয়েই। ফলে মাঝপথে এসে ঝরে পড়ছে দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী। সম্প্রতি কয়েকটি ইনডিকেটরে এমন চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু এক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ক্ষতি নয় রবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও বড় হুমকি।

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
  • এসএসসি পাসের পর ঝরে পড়ার হার সর্বাধিক
  • মূল কারণ শিক্ষাব্যয় ও চাকরির সীমিত সুযোগ

যেখান থেকে শিক্ষাজীবনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হওয়ার কথা, ঠিক সেখানেই শেষ হচ্ছে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর। মাধ্যমিক বা এসএসসি পাসের পরেই পড়াশোনার ইতি টানছেন তারা। মূলত উচ্চশিক্ষার গোড়া পত্তন হয় এসএসসি পাসের পরেই। কিন্তু তথ্য উপাত্ত বলছে এসএসসির পর কলেজে ভর্তি হলেও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারছেন না। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার ব্যয় এবং পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরি লাভের সীমিত সুযোগের কারণেই এসএসসি পাসের পর লেখাপড়ায় আগ্রহী হন না শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক উভয়েই। ফলে মাঝপথে এসে ঝরে পড়ছে দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী। সম্প্রতি কয়েকটি ইনডিকেটরে এমন চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু এক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ক্ষতি নয় রবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও বড় হুমকি।

বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ড এবং বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (বেনবেইস) সূত্র বলছে গত কয়েক বছরের মধ্যে চলতি বছরেই এসএসসি-পরবর্তী পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৩ লাখের বেশি শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলেও একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য আবেদন করে মাত্র পৌনে ১১ লাখের মতো। কারিগরি ধারায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বাদ দিলেও এক লাখের বেশি শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির আবেদনই করেনি।

আবার শুধু এসএসসি-পরবর্তী পর্যায়েই নয়, মাধ্যমিক স্তরেও এই ঝরে পড়ার চিত্র উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য দুই বছর আগে প্রায় ১৯ লাখ শিক্ষার্থী নবম শ্রেণীতে নিবন্ধন করলেও শেষ পর্যন্ত এসএসসির জন্য ফরম পূরণ করেছে ১৪ লাখ ৫০ হাজারের কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার লাখ নিবন্ধিত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়ার আগেই মূলধারার শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়েছে। গত ১ জুলাই বুধবার সচিবালয়ে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন যেসব তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এসএসসি পাসের পর কলেজে ভর্তি হয়ে দ্ইু বছর আগে নিয়মিত নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণই করেনি। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এ হার ৩৩ শতাংশের বেশি, মাদরাসা বোর্ডে প্রায় ৪৪ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষাবোর্ডে ৫৪ শতাংশেরও বেশি। শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শুধু পরীক্ষায় অনুপস্থিতির বিষয় নয়; এর বড় অংশই কার্যত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

যদিও শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে আরো কিছু কারণ রয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা, কোচিংনির্ভর শিক্ষা, গ্রামীণ এলাকায় মানসম্মত কলেজের সঙ্কট, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনার ঘাটতি অনেক শিক্ষার্থীকে উচ্চমাধ্যমিকে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের কাছে এসএসসির পর চাকরি বা আয়মুখী কাজে যুক্ত হওয়াই বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠছে। অপর দিকে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের বিশ্লেষণেও একই চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে নবম শ্রেণীতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষার্থী। শিক্ষকদের মতে, বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম, দারিদ্র্য, বিদেশমুখিতা, কারিগরি ধারায় স্থানান্তর এবং টেস্ট নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া সবই ঝরে পড়ার প্রধান কারণ।

উচ্চমাধ্যমিকে অনুপস্থিতি বেড়েছে

এদিকে গত ২ জুলাই থেকে সারা দেশে একযোগে শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অতীতের চেয়ে অনেক বেশি। প্রথম দিনে বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় মোট অনুপস্থিত ছিলেন ২৪ হাজার ৭৮৪ জন শিক্ষার্থী। অপর দিকে মাদরাসা বোর্ডে আলিম পরীক্ষায় কুরআন মাজিদ বিষয়ে অংশ নেয় ৮০ হাজার ৬৫৩ জন, অনুপস্থিত চার হাজার ৪৭৮ জন। আর কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের বাংলা-২ পরীক্ষায় অংশ নেয় ৮০ হাজার ৬০৩ জন, অনুপস্থিত ছিল তিন হাজার ৭৩ জন। বহিষ্কৃত হয়েছে একজন পরীক্ষার্থী।

গ্রামে ঝরে পড়ার হার বেশি

অবশ্য তথ্যসূত্র বলছে গ্রামীণ এলাকায় এই সঙ্কট আরো প্রকট। শহরের তুলনায় গ্রামে আর্থিক সঙ্কট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক চাপের কারণে মাধ্যমিকের পর শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। এসব বিষয়ে শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, সবচেয়ে বড় কারণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বর্তমানে কলেজে ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, বই-খাতা, যাতায়াত, কোচিং ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে গেছে। নি¤œ আয় ও নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের বহু শিক্ষার্থী এসএসসির পরই শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, যাতে পরিবারের আয়ে সহায়তা করা যায়। অন্য দিকে অনেক ছাত্রী বাল্যবিয়ের কারণে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হারাচ্ছে। আবার শুধু দারিদ্র্য নয়, শিক্ষাব্যবস্থার মানগত সমস্যাও শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করছে। কোচিংনির্ভর শিক্ষা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি, নতুন ও পুরনো শিক্ষাক্রমের পরিবর্তনের প্রভাব এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা অনেক শিক্ষার্থীকে বিকল্প পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে। ফলে এসএসসি পাস করেও তারা উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হচ্ছে না।

উপবৃত্তির পরিধি বাড়ানোর পরামর্শ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমাতে শুধু বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক দিলেই হবে না। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বৃত্তি ও উপবৃত্তির পরিধি বাড়ানো, গ্রামীণ কলেজে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি, শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি। শিক্ষাবিদদের ভাষায়, এসএসসি কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের শেষ ধাপ নয়; বরং এটি উচ্চশিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ। কিন্তু সেই সেতুতেই যদি প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী হারিয়ে যায়, তাহলে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এসএসসির পর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাব্যবস্থায় ধরে রাখতে এখনই কার্যকর নীতি ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।

৩ কারণে কমছে শিক্ষার্থী

কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ না নেয়ার পেছনে তিনটি সঙ্কট চিহ্নিত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান। তার মতে, সাম্প্রতিক আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি এবং অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতাই শিক্ষার্থীদের এই পরীক্ষাবিমুখতার মূল কারণ। তিনি বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সুস্থ ও আন্তরিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই সম্পর্কের অবনতি হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে অভিভাবকদের দায়িত্বও কম নয়। কলেজে ভর্তি করানোর পর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তান নিয়মিত ক্লাস করছে কি না, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না, এসব বিষয়ে পরিবারকে আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকারের ধারাবাহিক উদ্যোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্রিয় ভূমিকা এবং অভিভাবকদের সচেতন অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে এইচএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

বেড়েছে পড়াশোনার ব্যয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, দারিদ্র্য এখন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার সন্তানকে আর পড়াতে পারছে না। ফলে শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছে অথবা বিদেশমুখী হচ্ছে। তার মতে, এসএসসি পাসের পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে হারিয়ে যাওয়া জাতীয় উন্নয়নের জন্যও বড় ক্ষতি।

বাল্যবিয়ে : শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনের কারণ হিসেবে শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে, নিরাপত্তাহীনতা এবং পরিবারের সীমিত বিনিয়োগ বড় ভূমিকা রাখছে। শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করলেই হবে না; মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার জন্য সমন্বিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তাও প্রয়োজন।