ফিরে দেখা জুলাই ’২৪

লাল রঙে বদলে যায় আন্দোলন ভাষা, মার্চ ফর জাস্টিসের ডাক

Printed Edition
লাল রঙে বদলে যায় আন্দোলন ভাষা, মার্চ ফর জাস্টিসের ডাক
লাল রঙে বদলে যায় আন্দোলন ভাষা, মার্চ ফর জাস্টিসের ডাক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

২০২৪ সালের ৩০ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তাল সেই দিনগুলোতে বাংলাদেশের রাজপথ যেমন ছিল অস্থির, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের এক নতুন মঞ্চ। সরকার যখন রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালন করছিল, তখন আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ বেছে নিয়েছিল ভিন্ন এক প্রতীক, লাল। সেই লাল ছিল নিহতদের রক্তের স্মারক, প্রতিবাদের ভাষা এবং প্রতিরোধের প্রতীক।

এর আগের কয়েক দিনে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনায় দেশজুড়ে শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কদের আহ্বানে ৩০ জুলাই শিক্ষার্থীরা মুখ ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। একই সাথে অসংখ্য মানুষ নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল ছবি লাল রঙে পরিবর্তন করেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, লেখক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, বিভিন্ন পেশাজীবী থেকে শুরু করে প্রবাসী বাংলাদেশীরাও এই প্রতীকী কর্মসূচিতে অংশ নেন। অল্প সময়ের মধ্যেই লাল রঙে ভরে ওঠে ভার্চুয়াল জগৎ।

আন্দোলনকারীদের ভাষ্য ছিল, রাষ্ট্রীয় শোক দিবসের আনুষ্ঠানিকতার বিপরীতে এটি ছিল নিহতদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা এবং বিচার দাবির প্রতীকী প্রতিবাদ। তাদের মতে, কালো নয়, রক্তের লালই তুলে ধরছিল সেই সময়ের বাস্তবতা।

প্রতীকী এই প্রতিবাদ শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মুখে লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করেন। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করে। কোথাও প্রতিবাদী গানের মিছিল, কোথাও সমাবেশ, সবখানেই উঠে আসে বিচার ও জবাবদিহির দাবি।

এদিকে রাতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় নতুন কর্মসূচি, মার্চ ফর জাস্টিস’। ৩১ জুলাই দেশের সব আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজপথে এই কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়। ঘোষণায় ছাত্র-জনতার ওপর হত্যাকাণ্ড, গণগ্রেফতার, হামলা, গুম ও নির্যাতনের বিচার এবং জাতিসঙ্ঘের তদন্তের দাবি জানানো হয়। একই সাথে দেশের শিক্ষক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, পেশাজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।

সেদিন আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ‘দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’ এবং আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে খোলাচিঠি দিয়ে সহিংস দমন-পীড়নের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।

অন্য দিকে চলতে থাকে গ্রেফতার অভিযান। ঢাকাসহ সারা দেশে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক তখনও ডিবি হেফাজতে ছিলেন। তাদের মুক্তির দাবিতে বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় এবং কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে।

আজ ফিরে তাকালে দেখা যায়, ৩০ জুলাই ছিল আন্দোলনের কৌশলগত মোড় বদলের দিন। রাজপথের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও সেদিন পরিণত হয়েছিল প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে। মুখে বাঁধা লাল কাপড়, লাল প্রোফাইল ছবি এবং ‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এর ঘোষণা আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়। সেই লাল রঙ আজও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি শক্তিশালী প্রতীক যেখানে শোক, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং ন্যায়বিচারের দাবি একই সুতোয় গাঁথা হয়ে আছে।