প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের আগ্রহপত্র (ইওআই) আহ্বান

অবশেষে আলোর মুখ দেখছে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো

বশেষে আলোর মুখ দেখছে সাড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট। ২০০৮ সালে ডিপিপি প্রণয়ন করা হলেও দীর্ঘ সময় কার্যকর উদ্যোগ ছিল না এই প্রকল্পের। সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির একনেক অনুমোদন এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন করে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের জন্য আগ্রহপত্র (ইওআই) আহবান করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি।

ইআরএল সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের আওতাধীন বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির (ইআরপিএলসি) পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’ শীর্ষক প্রকল্পটি গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর একনেক সভায় অনুমোদিত হয় এবং চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দুই দিন আগে প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়া হয়।

সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের মোট অনুমোদিত ব্যয় একত্রিশ হাজার কোটি সাতান্ন লাখ টাকার মধ্যে ৬০ শতাংশ অর্থায়ন তথা ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা বাংলাদেশ সরকার-জিওবি এবং ৪০ শতাংশ তথা ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি ৮৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা অর্থায়ন করা হবে বিপিসির নিজস্ব তহবিল হতে।

সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ লাখ মেট্রিক টন। তন্মধ্যে ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল) তেল ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে পরিশোধন করা হয়। দেশের একমাত্র এই জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারটি চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল) তেলের মূল্য কম হলেও ১৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন রিফাইনারি না থাকায় অবশিষ্ট ৫৫ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি মূল্যে আমদানি করতে হয়।

মূলত বাংলাদেশে রিফাইনারি বা পরিশোধন কারখানার সক্ষমতা কম থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম কমে গেলেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ক্রুড অয়েল ক্রয় করে মজুদ করা সম্ভব হয় না। ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে এর প্রভাব সরাসরি স্থানীয় বাজারে অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলার পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের যে সঙ্কট তা বাংলাদেশে তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি তেল কিনে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্বিতীয় ইউনিট সময়মতো বাস্তবায়ন করা হলে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না বাংলাদেশকে এমন মত জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের।

এমনি পরিস্থিতিতে গতকাল সোমবার এই প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের (ইপিসি) জন্য প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) নিয়োগের জন্য এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) তথা আগ্রহপত্র আহবান করা হয়েছে। আগামী ৬ জুলাই আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন।

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, এই প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) ওই প্রকল্পের সামগ্রিক বিষয়াদি তদারকির দায়িত্বে থাকবে। সূত্র মতে, মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইর্আএল) প্রকল্পের যোগ্য বিবেচিত পিএমসি প্রতিষ্ঠানটি এই প্রকল্পের ভৌত নির্মাণকাজের পরিকল্পনা প্রণয়ন, কাজের মান ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কাজের শিডিউল নির্ধারণ, কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করণসহ সার্বিক নির্মাণকাজ তদারকি করবে। এ ছাড়া সব ধরনের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ যাবতীয় ক্রয়কার্যক্রম তদারকি করতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে।

সূত্র মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকায় তা পরিশোধন করে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হলে এ খাতে একদিকে যেমন আমদানি বাবদ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে, অপরদিকে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে। কিন্তু আমাদের রিফাইনারি বা পরিশোধন কারখানার সক্ষমতা কম থাকায় ১৫ লাখ মেট্রিক টনের চেয়ে বেশি ক্রুড অয়েল আমদানি করা সম্ভব হয় না। সূত্র মতে, বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে মাত্র ৩০-৪০ দিনের জন্য জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। অথচ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কমপক্ষে ৬০ দিনের জ্বালানি তেল মজুদ থাকা জরুরি।

সূত্র মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বার্ষিক ক্রুড অয়েল পরিশোধন ক্ষমতা ৩০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হবে। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানিনির্ভরতা হ্রাস এবং কম মূল্যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ক্রয় করে তা প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা যাবে।

সূত্র মতে, প্রকল্পটিতে বিনিয়োগকৃত অর্থ পাঁচ বছরের মধ্যেই ফেরত পাওয়া যাবে। তাছাড়া, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার ৪৫-৫০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব ইউরো-৫ মানের পেট্রোলিয়ামপণ্য উৎপন্ন হবে, যাতে সালফারের পরিমাণ হবে ১০ পিপিএমের চেয়ে কম, যা পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিবেচিত বলেও সূত্র জানায়।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত নয়া দিগন্তকে বলেন, ইওআই আহবান বহুল আকাক্সিক্ষত এই প্রকল্পের অগ্রগতির পথে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতেও এটা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে করে প্রকল্প কাজ দ্রুত এগোবে বলে আমরা আশাবাদী। তিনি বলেন, কনসালট্যান্ট নিয়োগের পরবর্তী ধাপ হবে ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) কনস্ট্রাক্টর নিয়োগ। তাও সুন্দরভাবে দ্রুত হবে বলে আশা রাখি। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ডিপিপিতে পাঁচ বছর ধরা হয়েছে বলেও তিনি জানান।