বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণে অনিয়মের কারণে সাতটি প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত হলেও এবার তাদেরকেই কাজ দেয়ার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে এই সাতটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে পাঠ্যবই ছাপা ও সরবরাহের কাজে অযোগ্য যোষণা করেছিল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। তবে মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সবুজ তালিকায় নিয়ে পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ দেয়ার জন্য টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এনসিটিবির একটি চক্র মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করছে বলেও অভিযোগ করেছেন অন্য প্রেস মালিকরা। এমনকি যাদের টেন্ডারেই অংশ নেয়ার সুযোগ ছিল না এখন তারাই নিষেধাজ্ঞা বাতিলের সুযোগে এনসিটিবিতে খবরদারি করছে। যদিও এনসিটিবির এই টেন্ডার প্রক্রিয়ার পুরোটাই এখন পরিচালিত হয় ই-জিপি-এর মাধ্যমে এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও পিপিএস (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট সিস্টেম) অনুযায়ীই নিয়ন্ত্রিত হয়; কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের পাঠ্যবই মুদ্রণে অনিয়ম আর শর্ত ভঙ্গের কারণে কালো তালিকাভুক্ত হয়েছিল তারা কিভাবে ২০২৭ সালের পাঠ্যবই মুদ্রণের টেন্ডারে অংশ নিচ্ছে বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজে নিম্ন মানের কাগজ ব্যবহার এবং বইয়ের প্রিন্টিংয়ে লেখা ও ছবি ঝাপসা, কাটিং এবং বাইন্ডিং শর্ত ভঙ্গ করা; এ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে উপজেলায় বই পৌঁছাতে না পারার কারণেই সাতটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে এক বছরের জন্য এনসিটিবিতে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। বলা হয়েছিল, এই প্রতিষ্ঠানগুলো এনসিটিবির কোনো কাজে এক বছরের মধ্যে অংশ নিতে পারবে না। সূত্র জানায়, এই সাত প্রতিষ্ঠান হলো আমাজন প্রিন্টিং প্রেস, ঠিকানা মাতুয়াইল, ঢাকা; বর্ণমালা প্রেস, ঠিকানা ১০/১ বি কে দাস লেন ঢাকা; পিবিএস প্রিন্টিং ঠিকানা আরামবাগ ঢাকা; টাঙ্গাইল অপসেট প্রেস, ঠিকানা আশুলিয়া, ঢাকা; নাহার প্রিন্টার্স, ঠিকানা বাদশা মিয়া রোড মাতুয়াইল, ঢাকা; সোহাগী প্রেস, ঠিকানা মুসলিম নগর মাতুয়াইল, ঢাকা এবং হাক্কানী প্রেস।
এ বিষয়ে এনসিটিবির নিয়মিত মুদ্রণকাজের সাথে জড়িত এক প্রেস মালিক জানান, সরকার পরিবর্তনের পর সবার মধ্যেই একটা ধারণা ছিল এনসিটিবি থেকে আগের আওয়ামী লীগের সময়ের সব অনিয়ম আর দুর্নীতির মূল উৎপাটন হবে। সবকিছু নতুনভাবে স্বচ্ছভাবে পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রিত হবে। কোথাও কোনো কাজের অনিয়ম কিংবা দুর্নীতি থাকবে না; কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি গ্রুপ সরকারের শিক্ষা সেক্টরের অর্জনকে ম্লান করে দিতেই চতুরতার সাথে এসব কালো তালিকার প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় এনসিটিবিতে সুযোগ করে দিচ্ছে। মাত্র এক বছর আগে যেখানে এই সাতটি প্রতিষ্ঠান পাঠ্যবই মুদ্রণে নিজেদের যোগ্যতা, দক্ষতা এবং সততার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে কী কারণে এবং কার বা কাদের স্বার্থ রক্ষা করে কালো তালিকা থেকে তাদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এনসিটিবিকে অনুসন্ধান করার দাবি জানিয়েছেন অন্যান্য প্রেস মালিক।
এ দিকে গতকাল রোববার বিকেলে আমাজন প্রিন্টিং প্রেসের মালিক মইনুল হোসেন নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে জানান, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে আমাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। আমরা পরবর্তী সময়ে এনসিটিবিতে আবেদন করেছি। এরপরেই আমাদেরকে কালো তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো জানান, আমরা প্রাথমিকের টেন্ডারে অংশ নেবো না। তবে মাধ্যমিকের টেন্ডার আহ্বান করা হলে আমরা অবশ্যই সেখানে অংশ নেবো।
টাঙ্গাইল অফসেট প্রেসের স্বত্বাধিকারি মীর মো: এমদান হোসেন রানা জানান, আমাদের ওপর অন্যায় ও জুলুম করা হয়েছিল। তবে পরে আমাদের আবেদন এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই কালো তালিকা থেকে আমাদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমার ছাপার মেশিন সম্প্রতি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে; কিন্তু এই মেশিনকেই পুরাতন এবং অকেজো হিসেবে রিপোর্ট দিয়ে আমাকে কালো তালিকায় ফেলা হয়েছিল। তবে আমি এখন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আশা করছি, টেন্ডারে অংশ নেবো এবং কাজ পেলে ভালোভাবে কাজও করব।
এনসিটিবির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ন্ত্রণ এবং কোনো অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করতেই মূলত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। এনসিটিবি তার এক ক্ষমতাবলেই কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার বা মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করলে তার পরিণতি বা শাস্তির প্রকারও ভিন্ন ভিন্ন হয়। যেমন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে এনসিটিবির টেন্ডার ও ক্রয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়া। চলমান কোনো চুক্তি থাকলে তা বাতিল বা স্থগিত করা। কার্যসম্পাদন জামানত (চবৎভড়ৎসধহপব ঝবপঁৎরঃু) বাজেয়াপ্ত হতে পারে, যদি চুক্তির শর্তে তা উল্লেখ থাকে। গুরুতর অনিয়ম, জালিয়াতি বা দুর্নীতির প্রমাণ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।



