এস আলমের বিদ্যুৎকেন্দ্রে ছাড়ে ৩২ লাখ ডলার ঋণ

রূপালী ব্যাংকের দায় নেবে না বাংলাদেশ ব্যাংক

আর্থিক খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেড’-এর অনুকূলে বিশেষ ছাড় দিয়ে ৩২ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে অনুমোদিত একটি বৈদেশিক মুদ্রার সিন্ডিকেটেড ঋণের আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের অংশে থাকা অবশিষ্ট ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৮ কোটি টাকা) ছাড়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও সরঞ্জাম আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রেও আইনি শর্ত শিথিল করা হয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

আর্থিক খাতে নজিরবিহীন লুটপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেড’-এর অনুকূলে বিশেষ ছাড় দিয়ে ৩২ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে অনুমোদিত একটি বৈদেশিক মুদ্রার সিন্ডিকেটেড ঋণের আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের অংশে থাকা অবশিষ্ট ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৮ কোটি টাকা) ছাড়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও সরঞ্জাম আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রেও আইনি শর্ত শিথিল করা হয়েছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বিতর্কিত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো- অর্থ ছাড়ের নির্দেশ দিলেও এর কোনো আর্থিক বা আইনি দায় নেবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনকি ভবিষ্যতে এই ঋণের টাকা আদায় না হলে বা খেলাপি হয়ে পড়লে রূপালী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে কোনো প্রকার আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে না; অর্থাৎ বিতর্কিত গ্রুপের প্রকল্পে অর্থ ছাড়ের রাস্তা সহজ করে দেয়া হলেও সম্পূর্ণ ঝুঁকির বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের কাঁধে।

আইনের ধারায় নজিরবিহীন ছাড়

গতকাল ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ (বিআরপিডি) থেকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১২১ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে এসএস পাওয়ার-১-এর অনুকূলে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে একই আইনের ২৭কক (৩) ধারার বিধিনিষেধ থেকে বিশেষ অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। সাধারণ নিয়মে কোনো একক গ্রাহক বা গ্রুপের সার্বিক খেলাপি স্থিতি ও ঋণসীমা (সিঙ্গেল বোরোয়ার এক্সপোজার লিমিট) অতিরিক্ত হলে নতুন করে এলসি বা ঋণ সুবিধা দেয়া নিষিদ্ধ। তবে বিশেষ ক্ষমতার বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই আইনি বাধ্যবাধকতা শিথিল করেছে।

ব্যাংক খাতে তীব্র বিতর্ক ও বড় প্রশ্ন

এস আলম গ্রুপ এককভাবে দেশের অন্তত ১১টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ভুয়া কাগজপত্র ও বেনামি নামে প্রায় সাকুল্যে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা বের করে নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে এসেছে। লুটে নেয়া এসব অর্থের বড় অংশই পাচার করা হয়েছে বিদেশে। লুটপাটের ধাক্কায় ইতোমধ্যে পাঁচটি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন ও তারল্য সঙ্কটে পড়ে একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় যেতে হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে একজন চিহ্নিত ব্যাংক লুটেরার প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা জারি রাখায় ব্যাংকিং খাতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে :

ঝুঁকির দায় কার : যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই এই ঋণের আর্থিক দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, সেখানে এই ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি কতটা মারাত্মক?

কেন এই অগ্রাধিকার : হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পলাতক ব্যক্তির ব্যবসাকে সচল রাখতে সরকারি ব্যাংকের অর্থ কেন ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে?

তারল্য ও সম্পদমানের ওপর চাপ : রূপালী ব্যাংক বর্তমানে নিজেই মূলধন ঘাটতি ও খেলাপির চাপে রয়েছে। এ অবস্থায় আদায় অনিশ্চিত জেনেও এ ধরনের ঋণে সম্মতি দেয়া ব্যাংকটির আমানতকারীদের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঘাড়েই আবার বিষফোঁড়া?

ব্যাংকিং নিয়মে কোনো বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধের ইতিহাস ও জামানতের মান যাচাই করা বাধ্যতামূলক। এসএস পাওয়ার-১-এর ক্ষেত্রে এসব সূচক কতটা ইতিবাচক, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রজ্ঞাপনে দায় এড়ানোর শর্ত জুড়ে দিয়ে নিজেদের আইনি ও নৈতিক দায় থেকে মুক্ত হতে চাইছে। কিন্তু রূপালী ব্যাংক একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত এই ঋণের কোনো ক্ষতি হলে তা পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্ব ও সাধারণ করদাতাদের ওপরই এসে পড়বে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তারল্য সঙ্কট ও খেলাপি ঋণের রেকর্ড বৃদ্ধির এ সময়ে একটি চিহ্নিত বিতর্কিত গ্রুপের পেছনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অর্থ নতুন করে ঝুঁকিতে ফেলা কতটা যুক্তিযুক্ত- এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে অর্থপাড়ায়।

ব্যাংক খাতে এস আলমের দায় : দখলদারিত্ব, অর্থপাচার ও সার্বিক ধ্বংসযজ্ঞ

এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম) রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ২০১৭ সালের পর থেকে একে একে দেশের অন্তত সাতটি প্রধান বেসরকারি ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের (এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক) পর্ষদ নিয়ন্ত্রণে নেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভুয়া কোম্পানি খোলার মাধ্যমে পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে এস আলম গ্রুপ প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা (১৮-১৯ বিলিয়ন ডলার) বের করে নেয়।

নজিরবিহীন খেলাপি ও অনিয়মের পাহাড় : শুধু ইসলামী ব্যাংক থেকেই মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ এককভাবে বের করে নিয়েছে এস আলম ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো। সম্প্রতি ঘোষিত ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ ২০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকার ১১টিই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন (যেমন : এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম রিফাইনড সুগার প্রভৃতি)। তাদের অনুমোদিত ঋণের বেশির ভাগই এখন মন্দ বা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।

নামমাত্র জামানত ও বেনামি ঋণের ফাঁদ : গ্রুপটির নেয়া মোট দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে তাদের বাস্তব ও ভৌত জামানতের আর্থিক মূল্য ছিল মাত্র প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকাই সম্পূর্ণ জামানতহীন ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ, যার বড় একটি অংশ কাগুজে কোম্পানির আড়ালে নিয়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার সামগ্রিক ধস ও একীভূতকরণের বাধ্যবাধকতা : এস আলমের নজিরবিহীন এই আর্থিক জালিয়াতির মাশুল গুনতে হচ্ছে পুরো দেশকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক তীব্র তারল্য সঙ্কটে পড়ে এবং ২০২৫-২৬ সময়ে পুরো ব্যাংকিং খাতে এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড নিট লোকসান গুনেছে। বিপর্যস্ত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে সচল রাখতে এখন বাংলাদেশ ব্যাংক পুনর্গঠন ও একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

সার্বিক অর্থনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব : এস আলমের ব্যাংকিং খাতের এই বিপুল ঋণখেলাপির ফলেই দেশের আর্থিক বাজারে চরম তারল্য সঙ্কট ও বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট তৈরি হয়; যার ফলে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে অবস্থিত এস আলমের ১১টি বড় কারখানা (চিনি, তেল, ইস্পাত) বন্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এ ছাড়া মূলধন ঘাটতি পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বারবার টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হয়েছে, যা দেশের মূল্যস্ফীতিকে নতুন উচ্চতায় ঠেলে দিয়েছে।

এমন চরম ঋণের চাপে জর্জরিত ও দেশের ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া গ্রুপের সংস্থাকেই (এসএস পাওয়ার-১) আবারো বিশেষ আইনি ছাড় দিয়ে নতুন এলসি ও ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে; যা দেশের পুরো অর্থব্যবস্থার ওপর চরম নেতিবাচক সঙ্কেত বহন করে।