অ্যাপলকে বদলে দিয়ে অবসরে যাচ্ছেন টিম কুক!

Printed Edition
অ্যাপলকে বদলে দিয়ে অবসরে যাচ্ছেন টিম কুক!
অ্যাপলকে বদলে দিয়ে অবসরে যাচ্ছেন টিম কুক!

আহমেদ ইফতেখার

দীর্ঘ ১৫ বছর অ্যাপলে নেতৃত্ব দেয়ার পর অবসর নিচ্ছেন টিম কুক। বর্ণাঢ্য কর্মজীবন অ্যাপলকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কুক ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর অ্যাপলের সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। তার স্থলাভিষিক্ত হবেন বর্তমানে অ্যাপলের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ও কোম্পানির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জন টার্নাস। কুক কোম্পানি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন না। তিনি নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নতুন দায়িত্ব পালন করবেন। তবে এ পরিবর্তনের মাধ্যমে অ্যাপলে ঐতিহাসিক এক অধ্যায়েরই সমাপ্তি ঘটছে।

স্টিভ জবস পরবর্তী সময়ে অ্যাপল যে কেবল টিকেই থাকবে না; বরং চার ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হবে এবং বার্ষিক আয় প্রায় চার গুণ বাড়বে, যা এক সময় অনেকের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল সেটিই করে দেখিয়েছেন কুক। তিনি নিজে অবশ্য বিনয়ের সাথে বলেছেন, অ্যাপলের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তার জীবনের ‘সেরা সম্মানের বিষয়’।

গত ১৫ বছরে কুক অ্যাপলের পণ্যের তালিকায় এমন অনেক কিছু যোগ করেছেন, যা স্টিভ জবসের রেখে যাওয়া আইফোন ও ম্যাকের গণ্ডি ছাড়িয়েছে।

অ্যাপল ওয়াচ : ২০১৫ সালে প্রথম বাজারে আসে অ্যাপল ওয়াচ। এর আগেও অ্যাপল স্মার্টওয়াচ তৈরির চেষ্টা হয়েছিল তবে তা খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে কুকের নেতৃত্বে থেমে থাকেনি অ্যাপল। কোম্পানিটি ক্রমাগত এর উন্নয়ন করে গেছে। ধীরে ধীরে অ্যাপল ওয়াচ কেবল ফ্যাশন অনুষঙ্গ বা ফোনের সঙ্গী হিসেবে নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবিষয়ক ডিভাইস হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করে নিয়েছে। বর্তমানে অ্যাপল ওয়াচের সর্বশেষ সিরিজ-১১, ‘ওয়াচ এসই-৩’ ও ‘ওয়াচ আলট্রা-৩’ এর মাধ্যমে কুক স্মার্টওয়াচের এমন এক পোর্টফোলিও তৈরি করেছেন, যার ক্রেতার গণ্ডি আইফোনের চেয়ে বিস্তৃত।

এয়ারপডস : ২০১৬ সালে প্রথম বাজারে আসে এয়ারপডস। ওই সময় তার ছাড়া ইয়ারবাড দেখতে অনেকটা এমন ছিল যেন কেউ সাধারণ ইয়ারপডসের তার কেটে দিয়েছে। তবে সেই উপহাস ছাপিয়ে এয়ারপডস আজ বিশ্বের অন্যতম পরিচিত প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে। জন টার্নাসের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং নেতৃত্ব ও কুকের আমলে এয়ারপডস কেবল সুবিধাজনক এক পণ্য থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ‘ইন-ইয়ার’ হেডফোনে পরিণত হয়েছে।

অ্যাপল সিলিকন : ২০২০ সালে ‘এম-১’ নামের চিপের মাধ্যমে ইনটেল থেকে অ্যাপলের নিজস্ব ডিজাইনের সিলিকনে রূপান্তর ছিল কোম্পানির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। এর ফলে অ্যাপল তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পায়।

এই চিপ অ্যাপলকে পারফরম্যান্স ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এখনো তা ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনের ফলেই অ্যাপলের ম্যাক বিভাগটি নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে ম্যাকের ৪০ বছরের ইতিহাসে কম্পিউটারটি বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ও জনপ্রিয় অবস্থানে রয়েছে, যার মূল ভিত্তি ‘অ্যাপল সিলিকন’। বর্তমানে অ্যাপল সিলিকন কেবল ম্যাকবুক প্রো বা ম্যাকবুক এয়ারের মতো কম্পিউটারেই ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং আইপ্যাড এয়ার থেকে শুরু করে আইপ্যাড প্রো পর্যন্ত সব ডিভাইসে শক্তি জোগাচ্ছে।

আইফোন এয়ার : জন টার্নাসের নেতৃত্বে তৈরি এ ফোনটি বিস্ময়কর রকমের পাতলা এবং এতে নতুন ধরনের উপাদান ও উৎপাদন কৌশল ব্যবহার করেছে অ্যাপল। আইফোন এয়ার থেকে ইঙ্গিত মেলে, টার্নাসের অধীনে অ্যাপলের হার্ডওয়্যার তৈরির লক্ষ্য এক নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে। কারিগরি দিক থেকে আইফোন এয়ার বিস্ময়কর উদ্ভাবন এবং একে অ্যাপলের ফোল্ডএবল বা ভাঁজ করা ফোনের দিকে এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।

এয়ারট্যাগ ও হোমপড : এয়ারট্যাগ মুদ্রার মতো গোলাকার ট্র্যাকিং ডিভাইস, যা হারিয়ে যাওয়া প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন চাবি, মানিব্যাগ, লাগেজ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। কুক এয়ারট্যাগকে সাধারণ ট্র্যাকিং ডিভাইসের চেয়েও বিশেষ কিছু হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এয়ারট্যাগকে সরাসরি আইফোন ও ‘ফাইন্ড মাই’ নেটওয়ার্কের সাথে যোগ করে তিনি ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট জিনিসগুলোকেও অ্যাপল ইকোসিস্টেমে নিয়ে এসেছেন।

অন্যদিকে, হোমপড ছিল অ্যাপলের স্মার্ট হোম বাজারে প্রবেশের সাহসী এক পদক্ষেপ। কুকের সিদ্ধান্ত অনুসারে, প্রতিযোগীদের সাশ্রয়ী স্পিকারের বদলে হোমপডকে উচ্চমানের এক মিউজিক ডিভাইস হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে। কুকের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল সিরিকে কেবল আইফোনে সীমিত না রেখে হোমপডের মাধ্যমে ঘরের সব জায়গায় পৌঁছে দেয়া। তবে স্টিভ জবসের মতো কুকের আমলেও কিছু পণ্য আশানুরূপ সাফল্য পায়নি। ‘অ্যাপল ভিশন প্রো’ ছিল কম্পিউটিংয়ের নতুন এক প্ল্যাটফর্ম তৈরির ক্ষেত্রে কুকের বড় বাজি, যা সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। সবকিছু সমসময় পরিকল্পনা অনুসারে সফল হয় না। তবে কুকের সাফল্য এ কারণেই ব্যাপক যে, তার বড় অর্জনের তুলনায় ব্যর্থতার পরিমাণ খুবই সামান্য।