চলনবিল হতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র

Printed Edition
চলনবিল হতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র
চলনবিল হতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র

শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)

দেশের উত্তর জনপদের এক বিরল ও ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক জলসম্পদ চলনবিল। এর যেমন বিশাল অবয়ব ও রূপের বৈচিত্র, তেমনি লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা উপকথা ও কিংবদন্তির ভাণ্ডারও অসীম। প্রচলিত প্রবাদ আছে, ‘বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম’। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বর্ষায় এই বিল সাগরের মতো উত্তাল ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে; শরতে রূপ নেয় শান্ত সবুজ জলাধারে। হেমন্তে পাকা ধান আর সোঁদা মাটির ম ম গন্ধ, শীতে হলুদ-সবুজের সমারোহ এবং গ্রীষ্মে বিলের রূপ রুক্ষ। তবে সব ঋতুতেই এখানে দর্শণার্থীদের মূল আকর্ষণ নৌকাভ্রমণ।

বর্ষা থেকে শরৎকাল পর্যন্ত বিশাল বিলজুড়ে ফুটে থাকে নয়নাভিরাম লাল, বেগুনি ও সাদা শাপলা। শাপলার রূপ এবং পাখিদের জলকেলি দেখতে ভিড় জমায় প্রকৃতিপ্রেমীরা। পানকৌড়ির ডুবসাঁতার, মাছরাঙার মাছ শিকারের অপূর্ব দৃশ্য আর ধবল বক, ফিঙে, ডাহুকের কলতানে মুখর থাকে পুরো প্রান্তর।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক বুকে ধারণ করে আছে এই জনপদ। দেশের অন্যতম বৃহত্তম গ্রাম ‘কলম’, চাটমোহরে জগৎশেঠের কুঠি, বুড়াপীরের দরগা, ফরিদপুরের বনওয়ারীনগর জমিদারবাড়ি, তাড়াশের কপিলেশ্বর মন্দির, বারুহাসের ইমাম বাড়ি, শীতলাইয়ের জমিদার বাড়ি ও হান্ডিয়ালের জগন্নাথ মন্দির অন্যতম দর্শনীয় স্থান। নাটোরের গুরুদাসপুরের খুবজিপুরে অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের প্রতিষ্ঠিত ‘চলনবিল জাদুঘর’-এ সংরক্ষিত আছে সুলতান নাসির উদ্দিনের নিজ হাতে লেখা কুরআন শরীফ ও প্রাচীন পুঁথি। এ ছাড়া চাটমোহরের হরিপুরে ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের লেখক নজিবর রহমান, প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী ও বড়াইগ্রামের জোয়াড়ীতে প্রমথ নাথ বিশীর বাসভবন বা স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে।

চলনবিলের লোকগাথা ও ধর্মীয় বিশ্বাস ঘিরে রয়েছে প্রাচীন নানা স্থাপনা। তাড়াশের নবগ্রামে রয়েছে নওগাঁ শাহি মসজিদ (মামার মসজিদ) ও চাদহীন ভাগ্নের মসজিদ। এর পাশে বাঘের পিঠে চড়ে ইসলাম প্রচারে আসা শাহ শরিফ জিন্দানি (রহ:)-এর মাজার অবস্থিত। চাটমোহরের ঐতিহাসিক সমাজ মসজিদ, সিরাজগঞ্জের নিমগাছিতে ফকির বিদ্রোহীদের আস্তানা, ভোলা দেওয়ানের মাজার এবং সিংড়ার তিশিখালীতে ঘাসী-ই-দেওয়ানের মাজার দর্শনার্থীদের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

বিলজুড়ে ছড়িয়ে আছে রোমাঞ্চকর অসংখ্য উপকথা। তাড়াশের বিনসারা গ্রামে মনসামঙ্গল কাব্যের নায়িকা বেহুলার বাবা সায় সওদাগরের বসতভিটা, জিয়ন কূপ এবং ‘বেহুলার খাড়ি’ ডিবির নিচে বেহুলার নৌকা চাপা পড়ে থাকার লোকবিশ্বাস এখনো প্রবল। নিমগাছির জয়সাগর দীঘি খননের পর রাজকুমারের সলিল সমাধি ও রাজবধূর অভিশাপের করুণ কাহিনী আজও স্থানীয়দের মুখে মুখে ফেরে। একইভাবে ব্রিটিশ আমলের দুর্ধর্ষ কোহিত ডাকাতের পুলিশের হাত থেকে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার গল্প কিংবা হান্ডিয়ালে বুড়াপীরের জমির সার্ভেয়ারের রক্তবমির অলৌকিক কাহিনী ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

সম্প্রতি চলনবিল পরিদর্শনে এসে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা জানান, সমন্বিত ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়নে শিগগিরই এখানে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হবে। ঐতিহাসিক প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে চলনবিল দেশের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে।