সাগর এক, ইলিশও এক শুধু নিষেধাজ্ঞায় ভিন্নতা!

বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞা ২২ দিন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১১ দিন

Printed Edition

পায়রা বন্দর (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা

বাংলাদেশে ইলিশের মূল প্রজননকাল সাধারণত আশ্বিনী পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময়কে ঘিরে। এ সময় মা ইলিশ ডিম ছাড়তে মোহনা কিংবা নদীমুখে আসে। এই সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখলে প্রজনন সফল হয় এবং উৎপাদন বাড়ে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অন্যান্য এলাকার মতোই উপকূলীয় পটুয়াখালীর বিভিন্ন মৎস্যঘাটে এখন নোঙর করে রাখা সারি সারি ট্রলার আর জালের স্তূপ। মূলত এখন ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। আর এই সময় নোনা পানি থেকে নদীর মিঠা পানিতে এসে ডিম ছাড়ে মা ইলিশ এবং আবার ডিম ছেড়ে সাগরেই ফিরে যায়। প্রজননচক্র যাতে বাধা বা ক্ষতির সম্মুখীন না হয়, সে জন্যই মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলছে সাগর, নদী ও মোহনায়। ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতেই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা জেলেদের এই বিরতি। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে। কিন্তু স্থানীয় জেলেরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, যখন বাংলাদেশের জেলেরা নদী ও সাগর থেকে মুখ ফিরিয়ে ঘাটে বসে, তখন প্রতিবেশী দেশের জেলেরা আর মাত্র চার দিন পরই আবারো মাছ ধরতে সাগরে নামতে পারবেন।

বাংলাদেশ সরকার মা ইলিশ সংরক্ষণে ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অন্য দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তা মাত্র ১১ দিন- ২ অক্টোবর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। উপকূলীয় এলাকার জেলেদের শঙ্কা- তাদের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে যদি প্রতিবেশী দেশের জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে নামে, তাহলে মা ইলিশের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হবে কি না? কিংবা বাংলাদেশের জেলেরা পরবর্তী সময়ে ক্ষতির মুখে পড়বে কি না?

তবে মৎস্য বিভাগ বলছে, ৯০ ভাগ ইলিশের বিচরণ বাংলাদেশ জলসীমায়। এই দেশের উপকূল অঞ্চলের নদী বা মোহনায় এসেই ডিম ছাড়ে মা ইলিশ, পরে আবার সাগরে ফিরে যায়। সুতরাং ইলিশ অন্য কোথাও যাওয়ার শঙ্কা নেই।

ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের গহিনখালী গ্রামের জেলে মজিবর প্যাদা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের দেশের নিষেধাজ্ঞা ২২ দিন আর ভারতের ১১ দিন। আমাদের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ভারতের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। তখন তো ভারতের জেলেরা মাছ ধরবে। আমরা তো ঘাটে বসে আছি। এখন তারা যাতে আমাদের সাগরে এসে মাছ ধরতে না পারে- সেটি ঠেকানো দরকার। তা না হলে নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে নেমে আমরা কাক্সিক্ষত মাছ পাবো না।’

একই ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের ট্রলার মালিক মিথেল হাওলাদার বলেন, ‘আমরা নিষেধাজ্ঞা মানি, ট্রলার ঘাটে বেঁধে রাখা; কিন্তু ওপাশে (পশ্চিমবঙ্গ) যদি মাছ ধরা শুরু হয়, তখন ইলিশ তো আর পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে সাঁতরে না! সীমানা ধরেও চলে না। তখন তো ক্ষতি হবে আমাদেরই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যদি বসে থাকি, আর ওরা সাগরে নামে, তাহলে মা ইলিশ রক্ষা করা সম্ভব নয়। এই সময় নজরদারি না বাড়ালে নিষেধাজ্ঞার পুরো উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হবে।’

স্থানীয় জেলেরা বলছেন, সাধারণ সময়েও ভারত ও মিয়ানমারের জেলেদের বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে মাছ ধরার বহু নজির রয়েছে। তাই এ সময় যেন কেউ বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে মাছ না ধরে, সে বিষয়ে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: কামরুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ‘আমাদের জলসীমায় যদি কেউ না আসতে পারে- তাহলে কোনো সমস্যা নেই। পাশের দেশ কী করল, কী না করল- এটা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। ৯০ ভাগ ইলিশই আমাদের অঞ্চলে এসে ডিম ছাড়ে। সুতরাং অন্য কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সাগর সীমানা পাহাড়া দেয়ার জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড রয়েছে। আমরা আশা করছি- মা ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমের ২২ দিন সেটি যথাপোযুক্ত সময় হয়েছে। এই সময়টায় আমরা যদি পাহারা সমুন্নত রাখতে পারি- তাহলে ইলিশগুলো নিরাপদে ডিম ছেড়ে মজুদ বৃদ্ধির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

তবে দুই দেশের নিষেধাজ্ঞার সময় আলাদা হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সাগর এক, ইলিশের প্রজাতিও এক; তাহলে নিষেধাজ্ঞা কেন এক নয়? আমাদের দেশে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা ২২ দিন যেটা বিজ্ঞানসম্মত, অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে তা মাত্র ১১ দিন। ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞার সঠিক প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয় অপরিহার্য, যাতে এক দেশের শিথিলতা অন্য দেশের জেলেদের ক্ষতির কারণ না হয়।’তিনি আরো বলেন, ‘ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় গর্ব; এটি আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবিকার প্রতীক। যদি দুই দেশের নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা একই করা যায়, তাহলে তা আরো ফলপ্রসূ ও কার্যকর হবে, মা ইলিশও নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারবে। ভবিষ্যতে প্রতিবেশী দেশগুলো একযোগে ইলিশ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবে এই আশাই করছি।’

চলতি বছরে প্রথমবারের মতো মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে বঙ্গোপসাগরে ভারতের সাথে মিল রেখে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন করেছিল বাংলাদেশ সরকার।