এম এ রকিব শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
দীর্ঘ দিনের জনবল সঙ্কটে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা। দেশের অন্যতম পর্যটনসমৃদ্ধ ও চায়ের রাজধানীখ্যাত এই এলাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীর অভাবে রোগীদের কাক্সিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
২০১২ সালে হাসপাতালটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জন্য সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত কাঠামোর তুলনায় বর্তমানে ৭৭ জন জনবল ঘাটতি রয়েছে।
তীব্র সঙ্কটের মধ্যেও চিকিৎসাসেবার কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: সিনথিয়া তাসমিন। তিনি জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত হাসপাতালে দুই হাজার ৭২৬টি স্বাভাবিক প্রসব এবং ১১৩টি সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এ অবস্থার মধ্যেও দেশের ৪৯০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে শ্রীমঙ্গল ১১তম অবস্থানে রয়েছে।
তবে জনবল ঘাটতির প্রভাব পড়ছে প্রায় সব সেবায়। বর্তমানে ছয়টি কনসালট্যান্ট, পাঁচটি মেডিক্যাল অফিসার, চারটি সহকারী সার্জন এবং সাতটি সিনিয়র স্টাফ নার্সের পদ শূন্য রয়েছে। পাশাপাশি রেসিডেন্ট মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও), ফার্মাসিস্ট, টেকনোলজিস্ট, অফিস স্টাফ, স্বাস্থ্য সহকারী, ওয়ার্ড বয়, আয়া, বাবুর্চি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর একাধিক পদ দীর্ঘ দিন ধরে খালি রয়েছে।
হাসপাতালের জরুরি সেবাও সীমিত। বর্তমানে একটি মাত্র অ্যাম্বুলেন্স চালু রয়েছে, যা পরিচালিত হচ্ছে একজন চালক দিয়ে। যদিও প্রয়োজন অন্তত দু’টি অ্যাম্বুলেন্স ও দুইজন চালক। পুরো হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র একজন নৈশপ্রহরী।
জনবল ও টেকনিশিয়ানের অভাবে হাসপাতালের এক্স-রে, ইসিজি ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন প্রায় ১৮ বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ফলে রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরে অতিরিক্ত খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় তিন লাখ ৬১ হাজার ৮০১ জন মানুষের বিপরীতে মাত্র ১৬ জন চিকিৎসক কর্মরত। অর্থাৎ একজন চিকিৎসককে গড়ে ২২ হাজার ৬১২ জন মানুষকে সেবা দিতে হচ্ছে, যেখানে অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৩৯টি। চিকিৎসক সঙ্কটের কারণে ইউনিয়ন পর্যায়ের চিকিৎসকদের দিয়েও জরুরি বিভাগের দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। কিন্তু এতে তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।
যন্ত্রপাতির ঘাটতিও প্রকট এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। বিপি মেশিন, স্টেথোস্কোপ, নেবুলাইজার, পালস অক্সিমিটার ও অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরের মতো জরুরি সরঞ্জামের অভাব রয়েছে এখানে। অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে পুরনো ভবনের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। ফলে বৃষ্টি-বাদলের সময় বিঘিœত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সুবিধারও অভাব রয়েছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, বর্র্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সঙ্কটে সেবার মান আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে পুরনো ভবন সংস্কার এবং নতুন ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: সিনথিয়া তাসমিন বলেন, তীব্র জনবল সঙ্কটের মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে চিকিৎসক, নার্স ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ঘাটতি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা: মো: মামুনুর রহমান বলেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সমস্যাগুলো সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছে এবং ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।



