আসাদুল ইসলাম সবুজ লালমনিরহাট
রেললাইনের পাশের ছোট মুদি দোকান। দোকানের ব্যস্ততার মধ্যেও দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শুনলেই ছুটে যান ৬৫ বছর বয়সী বেলাল হোসেন। হাতে তুলে নেন নীল-সবুজ পতাকা। যানবাহন ও পথচারীদের থামিয়ে নিশ্চিত করেন ট্রেনের নিরাপদ পারাপার। এভাবেই কোনো বেতন-ভাতা ছাড়াই ২৭ বছর ধরে লালমনিরহাটের একটি ঝুঁকিপূর্ণ রেলগেট পাহারা দিয়ে আসছেন তিনি।
লালমনিরহাট-বুড়িমারী রেলপথে একাধিক লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রেলপথে অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং ৯২টি এবং অনুমোদনহীন ৩০টি। এর মধ্যে মাত্র ৩২টি ক্রসিংয়ে গেটম্যান রয়েছেন। বাকিগুলো অরক্ষিত। এ পথে প্রতিদিন আন্তঃনগরসহ একাধিক ট্রেন চলাচল করে।
লালমনিরহাট পৌর শহরের খোঁচাবাড়ি মাস্টারপাড়া লেভেল ক্রসিংও দীর্ঘ দিন ধরে ছিল অরক্ষিত। করতোয়া, বুড়িমারী এক্সপ্রেস ও দোলনচাঁপাসহ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন এবং অন্যান্য ট্রেন এ ক্রসিং দিয়ে নিয়মিত চলাচল করে। ২৭ বছর আগে এই গেটের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল হোসেন।
বেলালের জীবিকার প্রধান অবলম্বন তার ছোট মুদি দোকান। তবে ট্রেন আসার শব্দ শুনলেই দোকানের কাজ পাশে রেখে ছুটে যান রেলগেটের কাছে। স্থানীয়দের থামিয়ে ট্রেন পার হওয়ার পরই যানবাহন ও পথচারীদের রেললাইন পার হতে দেন। দীর্ঘ দিন ধরে এভাবেই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমি গেটের পাশের ছোট মুদি দোকান চালাই। কোনো বেতন বা সুযোগ-সুবিধার জন্য এ কাজ করি না। এত বছর ধরে মানুষকে নিরাপদে রেললাইন পার হতে সাহায্য করছি।
তবে বেলালের এই স্বেচ্ছাশ্রমের আড়ালে রেলপথের নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি বড় ঘাটতির চিত্রও উঠে আসে। সাম্প্রতিক এক হিসাবে, লালমনিরহাট-বুড়িমারী রেলপথ ও সংশ্লিষ্ট ক্রসিং এলাকায় ১৫ মাসে ৬৫টি দুর্ঘটনায় ৩৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে।
রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় ম্যানেজার মোহাম্মদ তসলিম আহমেদ খান জানান, খোঁচাবাড়ি মাস্টারপাড়া রেলগেটে স্থায়ী গেটকিপার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
২৭ বছর ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা পারিশ্রমিক ছাড়াই বেলালের এই দায়িত্ব পালন তাই শুধু ব্যক্তিগত মানবিকতার গল্প নয়; একইসাথে অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়।



