রংপুর ব্যুরো
পুলিশের দাবি, আট হাজার টাকা ঋণের বোঝা মাথায় ছিল বিএ প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মুরসালিনের (১৯)। সেই টাকা জোগাড় করতেই সে খুন করে রংপুরের তারাগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশচন্দ্র রায় ও তার স্ত্রী সুবর্ণা রায়কে। এ ঘটনায় ব্যবহৃত কুড়ালের লাঠি এবং আলমিরা ভাঙা দা উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে মামলার বাদি হত্যাকাণ্ডের শিকার দম্পতির ছেলে শোভেন চন্দ্রের দাবি, মাত্র আট হাজার টাকার জন্য বাবা মাকে মেরেছে এটা মনে হচ্ছে না। এটা তো আমরা এখন পর্যন্ত মেনে নিচ্ছিও না। এখানে এর পেছনে আরো লোক আছে বা থাকতে পারে। তদন্ত চলছে। শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমিও কিছু বলতে পারব না ।
গতকাল শুক্রবার তারাগঞ্জের পূর্ব রহিমাপুর হিন্দুপল্লীতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তার স্ত্রী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার মুরসালিনকে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কুড়াল উদ্ধার করতে গিয়ে এই তথ্য জানান রংপুর পুলিশ সুপার মারুফাত হোসাইন।
মুরসালিনের স্বীকারোক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে এসপি ব্রিফিংয়ে দাবি করেন, তারাগঞ্জ কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মুরসালিন আট হাজার টাকা ঋণের মধ্যে ছিল। সেই টাকা সে কোনোভাবেই পরিশোধ করতে পারছিল না। পড়ালেখার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ করত সে। ঘটনার কয়েকদিন আগে ওই বাড়িতে (যোগেশ চন্দ্রের বাড়ি) টাইলস মিস্ত্রির সাথে জোগালি কাজ করেছিল সে। এ সময় তার ধারণা হয় এই বাড়িতে অনেক টাকা পয়সা আছে।
প্রেসব্রিফিংয়ে এসপি আরো দাবি করেন, টাকা-পয়সা পরিশোধের চাপে পড়ার কারণেই ঘটনার দিন নিজ বাড়িতে থাকা কুড়াল নিয়ে যোগেশচন্দ্র রায়ের বাড়ির পেছনের আমগাছ দিয়ে দেয়াল টপকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে মুরসালিন। প্রথমেই রান্নাঘরে বেসিনে থালাবাসন ধোয়া অবস্থায় সুবর্ণা রায়কে মাথায় আঘাত করে এবং পরে একই কায়দায় যোগেশ চন্দ্রকে হত্যা করে। এরপর যোগেশের বাড়িতে থাকা একটি দা দিয়ে স্টিলের আলমিরা ভেঙে ফেলে। কিন্তু তাতে কোন টাকা পয়সা না পাওয়ায় আবারো যে পথে ঢুকে ছিল সেই পথ দিয়েই বের হয়ে যায়। পরে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কুড়ালটি পাশের মজা পুকুরে ফেলে দেয়।’
এসপি আরো দাবি করেন, ‘গ্রেফতারের পর যোগেশ চন্দ্র রায়ের বাড়িতে নিয়ে আসা হয় মুরসালিনকে।। তার দেখানো স্থান থেকে আলমিরা ভাঙার কাজে ব্যবহৃত দাটি উদ্ধার করা হয়। এরপর মজা পুকুরে তার দেখানো স্থান থেকে কুড়ালের বাঁশের লাঠিটি উদ্ধার করা হয়। লাঠিতে রক্তের দাগ ছিল। এরপর তার দেখানো মতে মজাপুকুর থেকে লোহার অংশ উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য স্যালো মেশিন দিয়ে পুকুরটির পানি সেচা হচ্ছে এবং এরই মধ্যে ডুবুরিও আনা হয়েছে।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এসপি বলেন, ‘মুরসালিনের বয়স হবে ১৯-২০ বছর। সম্পূর্ণ টগবগে চেহারা তার। পেছনে তার কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড আমরা পাইনি। পেশাদার খুনিও সে নয়। শুধু টাকার জন্যই সে একাই এত বড় জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। সে মনে করেছে যেহেতু সৎকার করা হয়েছে মরদেহের। কেউ টের পাবে না। সে কারণে বাড়িতেই অবস্থান করছিল সে। আমরা তাকে ধরে নিয়ে আসার দুই তিন ঘণ্টা পর সে বুঝতে পারে যে ওই ঘটনায় তাকে আমরা গ্রেফতার করেছি।’
গ্রেফতার এবং অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা প্রসঙ্গে মামলার বাদি হত্যাকাণ্ডের শিকার দম্পতির প্রথম পুত্র র্যাব কর্মকর্তা শোভেন চন্দ্র রায় জানান, ‘গ্রেফতারের বিষয়ে স্বস্তি পাচ্ছি, কিন্তু এর পেছনে কে বা কারা জড়িত এটা এখনো তদন্তপ্রক্রিয়া চলমান। যেহেতু আমার সিনিয়র স্যাররা আছে তদন্তের কাজ এখনো শেষ হয় নাই। তদন্ত চলছে চলুক, শেষ পর্যন্ত কি রেজাল্ট আসে, কারা কারা জড়িত আছে, উদঘাটন হোক। অবশ্যই কেউ না কেউ জড়িত আছে। এটা তদন্ত চলছে চলুক।’
শোভেন চন্দ্র রায় বলেন, ‘মাত্র আট হাজার টাকার জন্য বাবা মাকে মারছে এটা মনে হচ্ছে না। এটা তো আমরা এখন পর্যন্ত মেনে নিচ্ছিও না। এখানে এর পেছনে আরো লোক আছে বা থাকতে পারে। তদন্ত চলছে। শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমিও কিছু বলতে পারবো না ।’
বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের ফাজিলপুর (খিয়ার জুম্মা) এলাকার নিজ বাড়ি থেকে মুরসালিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালায় পুলিশ।
গত রোববার তারাগঞ্জের পূর্ব রহিমাপুরের নিজ বাড়ির ডাইনিং রুম থেকে কুরশা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহবায়ক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় ও রান্নাঘর থেকে তার স্ত্রী সুবর্ণা রায়ের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরদিন সোমবার ময়নাতদন্ত শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চাকলা শ্মশানে সৎকার করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায়ের। একই শ্মশানে সৎকার করা হয় তার স্ত্রী সুবর্ণা রায়কও। এ ঘটনায় তার বড় ছেলে পুলিশের এসআই র্যাব-৫ এর অধীনে সিপিসি-৩ জয়পুরহাটে কর্মরত শোভন চন্দ্র রায় অজ্ঞাতনামাদের নামে তারাগঞ্জ থানায় হত্যামামলা করেন। এই দম্পতির অপর ছেলে ঢাকায় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত আছেন।
এর আগে ব্রিফিংয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন এবং প্রাথমিক তদন্তের উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশ সুপার মারুফাত হোসাইন জানিয়েছিলেন, ‘সুবর্ণার কপালে এবং জোগেশের মাথার পেছনে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। সেটা দাও হতে পারে। তবে আমার ধারণা চাইনিজ কুড়াল দিয়ে আঘাত করেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। মোবাইল ঘেঁটে আমরা এখন পর্যন্ত যেটা নিশ্চিত হয়েছি শনিবার রাত ৯টা ২২ মিনিটে ছোট ছেলের সাথে কথা হয়েছিল তাদের। আলামত দেখে যা আমরা ধারণা করছি যে, শনিবার রাতের প্রথম ভাগে দশটা থেকে ১১টার মধ্যেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সুবর্ণার লাশ রান্নাঘরের বেসিনের পাশে ছিল মনে হচ্ছিল। এ সময় তিনি থালাবাটি পরিষ্কার করছিলেন। তবে ওই বাড়ি থেকে কোনো কিছু খোয়া যায়নি। আঘাতের ধরন বিশ্লেষণ করে পুলিশ আরো জানিয়েছিল চাইনিজ কুড়ালের আঘাতেই ঘটনাটি ঘটার সম্ভাবনা বেশি। খুনি ছিল পেশাদার।’
এ দিকে ঘটনার দিন বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায়ের বড় ছেলে সোহেল চন্দ্র রায় জানিয়েছিলেন ‘ও যে সামনে একটা শ্মশান দেখতেছেন। ওই জমিটা বাবা দান করেন। তখন থেকে বাবার কিছু শত্রুতা তৈরি হয়। কেন ও দান করবে জমি? এটা নিয়ে যে শত্রুতা তৈরি হয়েছে এটা এলাকাবাসী সবাই জানে। এলাকাবাসীর মুখে যতটুকু শুনি, মোবাইলফোনে যতটুকু শুনি বাবা মা এটা নিয়ে খুব হুমকির মধ্যে ছিল। তারা এ নিয়ে ডিপ্রেশনে ভোগছিল। যে যখন তখন তাদেরকে মারতে পারে। এ ছাড়াও আরো একটি জমি আছে আমাদের পরিবারের। ওই জমিটাতে বাবার বাবা একজনকে বাড়ি করে থাকতে দিয়েছিল। তিনি উঠে গেছেন। ওই জমিটা নিয়েও গণ্ডগোল। আমার বাবার শত্রু বলতে আমার গ্রামের মানুষ। তিনি চার্জশিট দিয়ে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।’



