ভোটের কাউন্টডাউন : আর মাত্র ৯ দিন বাকি

কথার লড়াই রূপ নিচ্ছে রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে

ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে রাজনীতির মাঠ ততই উত্তপ্ত হচ্ছে। দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এই প্রথমবারের মতো। কার্যক্রম নিষিদ্ধি হওয়ায় আওয়ামী লীগ এখন ভোটের বাইরে। হাসিনার পতনের পর জুলাইপন্থী দলগুলোর সাথে দীর্ঘ আলোচনা শেষে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’। কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা ‘না’-এর পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরি করে মাঠে নেমেছে প্রকাশ্যে।

কাওসার আজম
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের কাউন্টডাউন চলছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আর বাকি মাত্র ৯ দিন। ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে রাজনীতির মাঠ ততই উত্তপ্ত হচ্ছে। দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এই প্রথমবারের মতো। কার্যক্রম নিষিদ্ধি হওয়ায় আওয়ামী লীগ এখন ভোটের বাইরে। হাসিনার পতনের পর জুলাইপন্থী দলগুলোর সাথে দীর্ঘ আলোচনা শেষে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’। কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা ‘না’-এর পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরি করে মাঠে নেমেছে প্রকাশ্যে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ জোটের শরিকরা নিজ নিজ প্রতীকের পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করে আসছে শুরু থেকেই। এতদিন বিএনপির অবস্থান নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলেও গত শুক্রবার রাতে রংপুরে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ধানের শীষের পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। ফলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে একটা গতি হলেও আগামী নির্বাচনে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ভোটের রাজনীতি ক্রমেই সঙ্ঘাতপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুরু থেকেই জামায়াত ও এনসিপি সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপি সংস্কারের বিপক্ষে না থাকলেও আগামী নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ‘অতীত অভিজ্ঞতা’কেই সামনে আনছে। তাই ভোটের মাঠে ‘সংস্কার বনাম ক্ষমতার ধারাবাহিকতার লড়াই’- এই বিষয়টি সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলছে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ব্যালট পেপার ছাপানোসহ নির্বাচনকেন্দ্রিক সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। নিরপেক্ষতা বজায় রেখে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়াই এখন তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ জারি করেছেন রাষ্ট্রপতি। এই আদেশের আলোকেই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে; এতে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যরা একই সাথে নিয়মিত সংসদের সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করবে। তবে পরিষদ নির্দিষ্ট সময়ে সংবিধান সংস্কার না করলে কী হবে, তা বাস্তবায়ন আদেশে উল্লেøখ নেই। গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। সে ক্ষেত্রে এ সংক্রান্ত সংস্কার নির্ভর করবে ভবিষ্যতে কারা ক্ষমতায় যাবে এবং সংসদে তাদের কতটা সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে তার ওপর।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এতদিন সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানোর পর তিন দিন আগে নির্বাচন কমিশন থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এতে বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তারা প্রচারণায় অংশ নিতে পারবে না, এটি শাস্তিযোগ্য। যদিও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টার মর্যাদায় গণভোটের প্রচারণার দায়িত্বপ্রাপ্ত) অধ্যাপক আলী রীয়াজ পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, এতে আইনি বাধা নেই। এ নিয়ে যখন টানাপড়েন, তার মধ্যেই গত শুক্রবার রাতে রংপুরের জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেয়ার কথা বলেন। এতে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল তা অনেকটা দূর হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসির মূল চ্যালেঞ্জ নিরপেক্ষতার সাথে সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠান : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় এই ভোট শুধু সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়; বরং দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর বা টানা তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার হরণের পর মানুষের মধ্যে যে অনাস্থা ও ক্ষোভ জমেছে, তা প্রশাসনের একটি বড় পরীক্ষাও বটে। নির্বাচনের আর মাত্র ৯ দিন বাকি- মানুষের আগ্রহ যেমন তুঙ্গে, তেমনি আশঙ্কাও বাড়ছে- এই নির্বাচন কতটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে তা নিয়ে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষনেতাদের মধ্যে প্রথম দিকে কথার লড়াই থাকলেও সম্প্রতি তা সঙ্ঘাতে রূপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে শেরপুরে জামায়াতে ইসলামী একজন উপজেলা সেক্রেটারি বিএনপির সাথে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হামলা বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। তাই সঙ্ঘাত এড়িয়ে ভোট সম্পন্ন করা আদৌ সম্ভব হবে কি না; প্রশাসনকে নিরপেক্ষ করে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পারবে কি না ইসি- এ নিয়েই এখন প্রশ্ন চার দিকে।

তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসনের সব নির্বাহী ক্ষমতা এখন নির্বাচন কমিশনের হাতে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত ধাপে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনার সারা দেশে ধারাবাহিক সফরে রয়েছেন। জেলা ও উপজেলাপর্যায়ে প্রশাসন, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সাথে বৈঠক করে তারা মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছেন। সাম্প্রতিক এক সমন্বয় সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভোটের দিন ও তার আগের সময়টুকুুতে সহিংসতা ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। তার ভাষায়, ‘আমরা কোনো সঙ্ঘাত চাই না। যারা ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও সঙ্ঘাতপ্রবণ এলাকাগুলো ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ, আনসার ও সশস্ত্রবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত ও দ্রুত বিচার কার্যক্রমও সক্রিয় থাকবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কথার লড়াই রাজনীতিতে থাকতেই পারে; কিন্তু সহিংসতায় গেলে নির্বাচন কমিশনকে জিরো টলারেন্স নীতিতে যেতে হবে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ রেখে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে সামাল দেয়া যাবে না।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) মো: রুহুল আমিন মল্লিক বলেন, যে আসনগুলোতে রিট হয়েছে, আদালতে মামলা হয়েছে- সেই আসনগুলোতে একটু পিছিয়ে রয়েছি। তা ছাড়া বাকি আসনগুলোর জন্য ব্যালট পেপার ছাড়ানোর কাজ প্রায় শেষের পথে। অন্য সব প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখভালে ইসিতে একটি সেন্ট্রাল সেল রয়েছে। এই সেল থেকে সারা দেশে নজর রাখা হচ্ছে।

ইসি সূত্র জানায়, ব্যালট পেপার ছাপা, পরিবহন ও সংরক্ষণ পুরো প্রক্রিয়াই কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তাবাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রশ্ন ওঠার সুযোগ না থাকে।

সংস্কার বনাম ক্ষমতার ধারাবাহিকতার লড়াই : বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তথা দুই দলের ভোটের লড়াই দীর্ঘ দিনের। এবারই প্রথম মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দীর্ঘ দিনের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির অতীতে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভোটের মাঠে এটা অন্যতম প্রচারণা দলটির নেতাদের। অতীতের ধারাবাহিকতায় দলটি আগামীতে সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনায় জনগণের সমর্থন কামনা করছে। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামী ও নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি স্বাধীনতাপরবর্তী দীর্ঘ ৫৪ বছরে দেশের অভ্যন্তরে জমে থাকা অনিয়ম, দুর্নীতি আর দুঃশাসনের ইতি টেনে সংস্কারের মাধ্যমে আগামীতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ভোটের মাঠে এখন ‘সংস্কার বনাম ক্ষমতার ধারাবাহিকতার লড়াই’ জমে উঠছে। দিন যতই যাচ্ছে, এই লড়াই ততই নানা বাঁকে মোড় নিচ্ছে।