নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- মানবিক সংস্থায় পানি-বিদ্যুৎ বন্ধের আইন ইসরাইলের
- গাজায় বিদেশী গণমাধ্যম প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে চায় ইসরাইল
- ডিসেম্বর মাসে সাংবাদিকদের ৯৯ বার হামলা করেছে ইসরাইল
ইসরাইলি সেনারা গাজার পূর্বাঞ্চলে তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ আরো বিস্তৃত করেছে। বিশেষ করে গাজা সিটির তুফাহ, শুজাইয়া ও জেইতুন এলাকায় এ দখল বাড়ানো হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনিরা আরো ছোট ছোট জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। গতকাল সোমবার ইসরাইলি সেনাদের এ পদক্ষেপ তাদের সালাহুদ্দিন সড়কের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। ফলে আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলোকে চলে যেতে হচ্ছে। ইসরাইলের গাজায় চলমান যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই। গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ জানিয়েছেন, ইসরাইলি হামলা ও ‘হলুদ রেখা’ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের আরো জায়গা দখল করা হচ্ছে। এতে মানুষের আশ্রয়ের জায়গা ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এখানে জনসংখ্যা দ্বিগুণ নয়, তিনগুণ হয়ে গেছে। কারণ কেউই তাদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরতে পারছে না। আমরা তুফাহ, শুজাইয়া ও জেইতুনের কথা বলছি।
মাহমুদ আরো জানান, রোববার রাত থেকে ড্রোন ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কয়েক মিনিট আগে তা কিছুটা থেমেছে। সোমবার গাজার দক্ষিণাঞ্চলেও তীব্র গোলাবর্ষণ ও হেলিকপ্টার হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। রাফাহ ও খান ইউনুস শহরের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল এ হামলার শিকার হয়েছে। রোববার ইসরাইল গাজার এমন কিছু এলাকায় হামলা চালায়, যা তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই। খান ইউনুসে আলাদা হামলায় অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে চিকিৎসা সূত্রে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় গাজার মাগাজি শরণার্থী শিবিরে আল-শানা পরিবারের পাঁচতলা ভবন ধসে পড়ে। ভবনটি ২০২৩ সালের শেষ দিকে ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সিভিল ডিফেন্স দল ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষ খুঁজছে। ওয়াফা সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।
রাফাহ সীমান্তকে ‘একমুখী প্রস্থান’ বানানোর চেষ্টা ইসরাইলের
রাফাহ সীমান্ত ফের খোলার সম্ভাবনা নিয়ে গাজায় আশা ও আতঙ্ক একসাথে বেড়েছে। অনেকে মনে করছেন, এটি অসুস্থ ও আহতদের চিকিৎসার সুযোগ দেবে, বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলোকে পুনর্মিলিত করবে এবং কিছু মানুষকে গাজায় প্রবেশ বা বের হওয়ার সুযোগ দেবে। তবে আশঙ্কাও প্রবল। অনেকেই মনে করছেন, সীমান্ত খোলা সীমিত ও অস্থায়ী হবে। আবার কেউ কেউ ভয় পাচ্ছেন, এটি একমুখী প্রস্থান হয়ে যাবে। এতে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের শঙ্কা তৈরি হবে এবং যারা বের হবেন তারা হয়তো আর ফিরতে পারবেন না।
আল-জাজিরার মাহমুদ জানিয়েছেন, ‘এখন পর্যন্ত শুধু শিরোনামই পড়ছি। ধারণা করা হচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যে রাফাহ সীমান্ত খুলে দেয়া হবে। তবে ইসরাইলি সেনারা চাইছে এটি শুধু একমুখী প্রস্থান হোক।’ মাসের পর মাস অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা গাজার মানুষ এখন সতর্ক। তারা ভয় পাচ্ছেন, সামান্য স্বস্তির সম্ভাবনাও নতুন প্রশ্ন ও অবিশ্বাস নিয়ে আসবে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসনে অন্তত ৭১ হাজার ৩৮৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং এক লাখ ৭১ হাজার ২৬৪ জন আহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গত তিন মাসে আরো ৪২০ জন নিহত হয়েছেন।
ইসরাইলি সেনারা এখনো গাজার সীমান্তে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা আটকে রেখেছে। তারা দাবি করছে, কোনো সহায়তার ঘাটতি নেই। তবে জাতিসঙ্ঘ ও অন্যান্য সংস্থা বলছে, বাস্তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ।
মানবিক সংস্থায় পানি-বিদ্যুৎ বন্ধের আইন ইসরাইলের
সাতটি ইউরোপীয় দেশ সোমবার ইসরাইলের ইউএনআরডব্লিউএ বিরুদ্ধে করা আইনের নিন্দা জানিয়েছে। যেখানে জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত স্থাপনাগুলোতে পানি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বন্ধের কথা বলা হয়েছে। খবর আনাদোলুর।
আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, নরওয়ে, স্লোভেনিয়া ও স্পেনের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের পদক্ষেপ জাতিসঙ্ঘের ম্যান্ডেটকে দুর্বল করে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এবং আন্তর্জাতিক আদালতের রায়কে অমান্য করে। একই সাথে এটি ফিলিস্তিনি সাধারণ জনগণ ও শরণার্থীদের জন্য ভয়াবহ মানবিক পরিণতি ডেকে আনবে। বিবৃতিতে ইসরাইলকে আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো গাজায় কাজ চালিয়ে যেতে পারে এবং কোনো সংস্থার নিবন্ধন বাতিল না করা হয়। তারা উল্লেখ করেছে, জাতিসঙ্ঘ বিশেষ করে ইউএনআরডব্লিউএ এবং অন্যান্য মানবিক সংস্থা ও এনজিওগুলোর কাজ গাজার ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত জরুরি। বিবৃতিতে বলা হয়, পূর্ণ, নিরাপদ ও বাধাহীন মানবিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং জাতিসঙ্ঘের মানবিক কার্যক্রম ও তাদের অংশীদারদের কার্যক্রম চালু রাখা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও সংশ্লিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতার অংশ।
তারা আরো বলেছে, জাতিসঙ্ঘের বিশেষাধিকার ও দায়মুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনকে সম্মান করা অত্যাবশ্যক। গত সপ্তাহে ইসরাইলের সংসদ ইউএনআরডব্লিউএ কার্যক্রম বন্ধের আইনে সংশোধনী অনুমোদন করেছে, যার মাধ্যমে সংস্থাটির স্থাপনাগুলোতে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা যুদ্ধ শেষ করতে ২০ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এতে যুদ্ধবিরতি, ইসরাইলি বন্দীদের মুক্তি, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, একটি প্রযুক্তিবিদ প্রশাসন গঠন এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। চুক্তির প্রথম ধাপ কার্যকর হয় ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর। তবে ইসরাইল কিছু শর্ত লঙ্ঘন করেছে এবং দ্বিতীয় ধাপে যেতে বিলম্ব করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি সেনারা শত শতবার লঙ্ঘন করেছে। এসব ঘটনায় ৪২০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১১৮৪ জন আহত হয়েছেন। এই যুদ্ধবিরতি ইসরাইলের দুই বছরের যুদ্ধ থামায়। যুদ্ধে প্রায় ৭১ হাজার ৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছিলেন আরো এক লাখ ৭১ হাজার ২০০ জন। পুরো গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
ডিসেম্বর মাসে সাংবাদিকদের ওপর ৯৯ বার হামলা করেছে ইসরাইল
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ইসরাইল ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মোট ৯৯টি লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হত্যা, শারীরিক হামলা, আটক এবং সংবাদ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা বলে জানিয়েছে আনাদোলু।
মাসিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ইসরাইলি বাহিনী ডিসেম্বর মাসে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে গুরুতর লঙ্ঘন চালিয়েছে। ইউনিয়নের স্বাধীনতা কমিটি জানায়, মাসজুড়ে ৯৯টি লঙ্ঘন নথিভুক্ত হয়েছে, যা সাংবাদিকতার কাজে দমন ও সীমাবদ্ধতার উচ্চ মাত্রা নির্দেশ করে। রিপোর্টে বলা হয়, গাজায় দায়িত্ব পালনকালে একজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, দুজন সাংবাদিক গোলাবর্ষণ ও সরাসরি হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন এবং দুই সাংবাদিকের আত্মীয় নিহত হয়েছেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ৪৮টি আটক ও সংবাদ প্রচারে বাধা, ১৫টি হামলা যেখানে টিয়ার গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে, সাংবাদিকদের ওপর দু’টি গাড়ি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা, অস্ত্র প্রদর্শন ও হুমকির ৯টি ঘটনা এবং সরাসরি মৌখিক হুমকির ছয়টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়, সংবাদ প্রচারে বাধা ও মাঠপর্যায়ের রিপোর্ট দমন ইসরাইলের একটি পরিকল্পিত নীতি, যার উদ্দেশ্য ছবি ও তথ্য প্রচার ঠেকানো। বিশেষ করে গাজা ও পশ্চিম তীরের জেরুজালেম, হেবরন, জেনিন ও রামাল্লাহ শহরে এ নীতি কার্যকর করা হয়েছে। ইউনিয়ন আরো জানায়, সাংবাদিকদের ওপর দু’টি মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। একটি সাংবাদিকতার সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে এবং ইসরাইলি হামলায় দুই সাংবাদিকের বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া দুই সাংবাদিককে গ্রেফতার, দুজনকে নিরাপত্তা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব এবং ইসরাইলি গণমাধ্যমে সংগঠিত উসকানির দু’টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে সাংবাদিকদের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত বলে মিথ্যা দাবি করা হয়েছে।
গাজায় বিদেশী গণমাধ্যম প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে চায় ইসরাইল
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, গাজায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা উচিত। তারা বলছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে এ পদক্ষেপ প্রয়োজন। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইল বিদেশী সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে প্রবেশে বাধা দিয়েছে। খবর আল আরাবিয়ার।
এর পরিবর্তে ইসরাইল সীমিতসংখ্যক সাংবাদিককে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে, তবে তারা সেনাদের সাথে থেকে কাজ করতে পারছে। ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশন (এফপিএ), যা ইসরাইল ও ফিলিস্তিনে কর্মরত শতাধিক বিদেশী সাংবাদিককে প্রতিনিধিত্ব করে, ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে গাজায় অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য। এরপর আদালত ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে পরিকল্পনা দেয়ার জন্য কয়েক দফা সময় বাড়িয়েছে। তবে গত মাসে আদালত ৪ জানুয়ারি চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে।



