তারেক রহমান : এক সংস্কারক ও দূরদর্শী নেতা

Printed Edition

বাসস

জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান শুধু ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনই ঘটায়নি; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের সুবর্ণ সুযোগও সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর দেশের মানুষের মানসিক শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সংস্কারের দাবি তীব্র হয়ে ওঠে। তবে এই পরিবেশে মূল পরিবর্তনের প্রবর্তক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

তারেক রহমান দীর্ঘ দিন ধরে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চিন্তাশীল ছিলেন। ২০১৪ সালে লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে তিনি কোটা ব্যবস্থা সরকারি চাকরিতে ৫৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দেন। এর বাস্তবায়ন ঘটেছে ২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের আন্দোলনের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়াটি দেখিয়েছে যে, বর্তমান সংস্কার দাবি এবং আন্দোলনের পেছনে তারেক রহমানের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত।

বিএনপি এক দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। দলকে নিপীড়ন, মামলা, হামলা ও গুমের মধ্যেও এই দাবি থেকে সরানো যায়নি। ২০১৭ সালে ‘ভিশন ২০৩০’, ২০২২ সালে ২৭ দফা কর্মসূচি এবং ২০২৩ সালে ৩১ দফা রূপরেখা প্রণয়নের মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্রের সংস্কারের বিস্তৃত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। এই নীতিগুলো বর্তমান সময়ের সংস্কার দাবি ও সামাজিক চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৩১ দফা রূপরেখায় প্রধানত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনকল্যাণমূলক নারী নেতৃত্বাধীন খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তারেক রহমান কখনো প্রতিশোধ বা রাজনৈতিক হিংসার কথা বলেননি; বরং তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিয়েছেন।

তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় ভারসাম্য, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা এবং আইনের শাসন নিশ্চিতকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে না পারার বিধান প্রস্তাবিত করেছেন, যা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ করবে। ৩১ দফা রূপরেখায় সংবিধান সংস্কার কমিশন, ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন, জুডিশিয়াল কমিশন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, মিডিয়া কমিশন এবং অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশনের মতো প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিএনপি বিদ্যমান কালো আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যেমন আইসিটি আইন-২০০৭, সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮। একই সাথে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য ‘স্বাস্থ্য কার্ড’ চালু করা, শিক্ষা খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে ব্যবস্থা গ্রহণ, কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন খাত উন্নয়ন এবং রফতানিমুখী কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্পে প্রণোদনা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্প্রতি তারেক রহমান ‘জাতি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা’ নামে আট দফার একটি উন্নয়ন রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন। এতে কৃষি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ও সামাজিক সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত। কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু করার প্রস্তাব বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এতে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত, সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং কৃষি উন্নয়নের সুযোগ থাকবে।

তারেক রহমান সারা দেশে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ, ক্যান্সার, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসের কম খরচে চিকিৎসা এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভ্যাকসিন বিতরণের পরিকল্পনা করেছেন। তিনি ধর্মীয় নেতাদের কল্যাণ, নদী-খাল ও পরিবেশ সংরক্ষণ, ক্রীড়া উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রবর্তনের কথা বলেছেন।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রকৃত সংস্কারের পথ দেখিয়েছে। ৩১ দফা কর্মসূচি ও আট দফা উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতার পথে পরিচালিত করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ক্ষমতার অপব্যবহার কোনো ব্যক্তির দ্বারা আর হবে না। জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ধারাকে শক্তিশালী করা তার লক্ষ্য।

তারেক রহমানের পদক্ষেপ ও বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়নের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করে। তার এই দূরদর্শী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায্য ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করবে।