ছোটদের লাটিম খেলা : জাকির সেতু

Printed Edition
ছোটদের লাটিম খেলা : জাকির সেতু
ছোটদের লাটিম খেলা : জাকির সেতু

আজ সকাল থেকেই প্রচণ্ড বৃষ্টি। বসার ঘরের বারান্দায় দাদুভাই বসে আছেন। জুনায়েদ ও জুরাইন এসে তার পাশে বসল। দাদুভাই মুখ তুলে বললেন এই শ্রাবণের বৃষ্টি সহজে থামবে না।

দাদুর কথা শুনে জুনায়েদ ও জুরাইন গম্ভীর মুখে বলল, তাহলে দাদুভাই আজ আমাদের একটি গল্প বলো।

দাদুভাই হেসে বললেন, গল্প তো প্রতিদিনই বলি। আজ গল্পের বদলে তোমাদের লাটিম খেলার কথা বলব। সাথে দু’টি লাটিমও দেবো। বলো তো, তোমরা কেউ লাটিম খেলতে পারো?

জুনায়েদ বলল না দাদুভাই। তুমি আমাদের শিখিয়ে দেবে কিভাবে লাটিম খেলতে হয়?

জুনায়েদ ও জুরাইন বলল, স্কুল থেকে ফিরে যে সময় পাই, তোমার গল্প শুনি আর মোবাইলে গেম খেলি। দাদুভাই বললেন, মোবাইলে গেম বেশি খেলবে না। এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তার চেয়ে ফুটবল ক্রিকেট লাটিম কিংবা আরো নানা ধরনের দেশীয় খেলা খেলতে পারো। এসব খেললে শরীর ভালো থাকে মেধার বিকাশ ঘটে এবং খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বাড়ে।

দাদুভাই একটু থেমে আবার বললেন, এই শ্রাবণ মাসে একসময় এই বসার ঘরের বারান্দায় কত ছেলে লাটিম খেলত, ডাংগুলি খেলত! এখন আগের মতো আর কেউ আসে না। বিশাল এই মাঠটি প্রায় ফাঁকাই পড়ে থাকে।

এ কথা বলে দাদুভাই ঘর থেকে দু’টি লাটিম নিয়ে এলেন। তারপর বললেন লাটিম খেলায় একটি গোল বৃত্ত আঁকতে হয়। যে সুন্দরভাবে লাটিম ঘোরাতে পারে সে নিজের লাটিম বৃত্তের মাঝখানে রাখে না। আর যে ঠিকমতো ঘোরাতে পারে না তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজের লাটিম বৃত্তের ভেতরে রাখতে হয়। এরপর সবাই মিলে নিজেদের লাটিম দিয়ে সেই লাটিমে আঘাত করে। এটাই লাটিম খেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

এরপর দাদুভাই একটি লাটিম হাতে নিয়ে সুন্দর করে রশি পেঁচালেন। রশির এক প্রান্ত মধ্যম আঙুলে আটকে হালকা ভঙ্গিতে লাটিমটি মাটিতে ছেড়ে দিতেই সেটি সুন্দর করে ঘুরতে লাগল।

দাদুভাই বললেন, জুনায়েদ জুরাইন তোমরা কি মনোযোগ দিয়ে দেখছ? আমি কিভাবে রশি পেঁচিয়ে লাটিম ঘোরালাম? জবাবে জুরাইন বলল, হ্যাঁ দাদুভাই। আমরা মনোযোগ দিয়ে সব দেখছি। তুমি আর দু-একবার দেখিয়ে দাও তাহলেই আমরাও লাটিম খেলতে পারব।

দাদুভাই দু’টি লাটিম জুনায়েদ ও জুরাইনের হাতে দিয়ে বললেন এবার তোমরা চেষ্টা করো।

দু’জনেই কয়েকবার চেষ্টা করল। কিন্তু লাটিম ঠিকমতো ঘুরল না। তখন দাদুভাই বললেন, এটা শুধু শক্তির খেলা নয়। লাটিমকে আলত করে মাটিতে ছেড়ে দিতে হয়। তাহলেই এটি অনেকক্ষণ ধরে ঘুরবে। এবার জুনায়েদ আস্তে করে লাটিমটি মাটিতে ছেড়ে দিতেই সেটি সুন্দরভাবে ঘুরতে শুরু করল। লাটিম ঘুরতে দেখে জুনায়েদ ও জুরাইন আনন্দ করতে লাগল

দাদুভাই বললেন, আজ থেকে যখনই সময় পাবে কিংবা শ্রাবণের বৃষ্টিতে বাইরে যাওয়া সম্ভব হবে না তখন এই বসার ঘরের বারান্দায় এসে লাটিম খেলবে।

জুনায়েদ ও জুরাইন সম্মতি জানিয়ে বলল, আমরা আমাদের সহপাঠী ও বন্ধুদেরও লাটিম খেলা শিখিয়ে দেবো। সবাই মিলে খেলব। দাদুভাই আবেগভরা কণ্ঠে বললেন এই লাটিম নিয়ে আমি ছোটবেলায় কত খেলেছি! আহা কী দারুণ ছিল সেই দিনগুলো, সেই শৈশব! অথচ আজ তোমরা এই খেলাগুলোর সাথে তেমন পরিচিত নও। ধীরে ধীরে আমাদের ঐতিহ্যবাহী লাটিম খেলা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই তোমরা যদি এই খেলাটি খেলো, অন্যরাও উৎসাহিত হবে এবং আমাদের দেশীয় খেলার সাথে পরিচিত হতে পারবে।

দাদুর দিকে তাকিয়ে জুনায়েদ ও জুরাইন একসাথে বলল, আমরা সবাইকে লাটিম খেলা শিখিয়ে দেবো। সবাই মিলে খেলব, আর মোবাইলে গেম খেলে সময় নষ্ট করব না। দাদুভাই তাদের কথা শুনে খুব খুশি হলেন। বললেন আমি তোমাদের সহপাঠীদের একটি করে লাটিম দেবো। বাইরে তখন শ্রাবণের বৃষ্টি আরো জোরে ঝরতে শুরু করেছে।