ট্রফি এনে দেয়া খেলোয়াড়দের গন্তব্য কোথায়

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition
অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বকাপে চ্যালেঞ্জার ট্রফি জিতে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে বাংলাদেশ হকি দলকে ফুলেল অভিনন্দন	 : বাহফে
অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বকাপে চ্যালেঞ্জার ট্রফি জিতে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে বাংলাদেশ হকি দলকে ফুলেল অভিনন্দন : বাহফে

ভারতের চেন্নাই ও মাদুরাইতে অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বকাপ হকিতে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স করেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া-ফ্রান্সের মতো দলের সাথে লড়াই করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া-অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে চমকও দেখিয়েছে। ওমানকে তো উড়িয়েই দিয়েছে। বিশ^কাপে ১৭তম হয়ে জিতেছে চ্যালেঞ্জার ট্রফি। হকিতে এমন সাফল্যের পরও তাদের গন্তব্য অজানা। নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছেন না তাদের ভবিষ্যৎ কি ? বশ্বকাপে বাংলাদেশ শুধু সাফল্যই পায়নি। পেনাল্টি কর্নার বিশেষজ্ঞ আমিরুল ইসলাম ৫ হ্যাটট্রিকসহ ১৮ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও পেয়েছেন ২০ বছর বয়সী এই খেলোয়াড়। হকিতে নতুন করে জাগরণ হয়েছে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অর্জনটা ধরে রাখতে হবে। ঘরোয়া হকিসহ সারা দেশে চর্চা প্রয়োজন। এর জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের উচিত খেলোয়াড়দের ভালো পুরস্কার দেয়া। কারণ ওরা বিশ্বকাপে সাফল্য পেয়েছে। এটা চাট্টিখানি কথা নয়। কেউ কেউ বলছেন সরকারের উচিত হবে পুরস্কার হিসেবে তাদেরকে ফ্ল্যাট দেয়া কিংবা যোগ্যতা অনুযায়ী সবাইকে স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করা। হকি বোদ্ধারা দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক এই দলটি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা উচিত। তা না হলে ক্রমান্বয়ে সবাই হারিয়ে যাবে। ফেডারেশন ও সরকারের উচিত দুই, তিন অথবা চার বছরের পরিকল্পনা হাতে নেয়া। সাথে ভালো একজন বিদেশী কোচকেও লম্বা সময়ের জন্য রাখা উচিত। সাবেক জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা জোর দিলেন মাঠে খেলা রাখার। এশিয়ান গেমসের মতো চার বছর পরপর লিগ না হয়ে নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছরই লিগ হওয়া উ”িত। খেলোয়াড়দের রুটি রুজির ব্যবস্থা এখান থেকেই তো হয়। মাঠে নিয়মিত খেলা থাকতে হবে। ঢাকা লিগ আর ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আয়োজনের মাধ্যমে এই সময়টায় হকিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। উদ্যোগ নিতে হবে এখনই। তা না হলের তাদের সাফল্য শুধু কাগজে-কলমেই থেকে যাবে। হকির যে একটা হাইপ উঠেছে, সুযোগটা এখনই নিতে হবে। দাবি উঠেছে, আমিরুলকে সম্মান দিতে হবে আলাদাভাবে। বাঘা বাঘা দলের বিপক্ষে ৬টা ম্যাচের মধ্যে ৫টিতেই হ্যাটট্রিক, ১৮টা গোল, দলকে চ্যালেঞ্জার্স কাপ জেতাতে সবচেয়ে বেশি অবদান তার। তার জন্য কিছু করতে না পারলে হবে লজ্জার। তাকে পুরস্কৃত করা হলে অন্যরা পরবর্তী প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হয়। অনূর্ধ্ব-২১ দলটার জন্য অবশ্যই একটা ৩-৪ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। শুধু জুনিয়রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, সিনিয়র ওয়ার্ল্ডকাপ সামনে রেখে সবকিছু করতে হবে। প্লেয়ারদের আর্থিক নিরাপত্তা, পরিবার-সংসার চালানোর মতো ব্যবস্থা করতে হবে। তবে কারা করবে এগুলো। হকি ফেডারেশনের সেক্রেটারি তো বরাবরই বলেন, ‘টাকা নেই। ফেডারেশন খেলোয়াড় তৈরি করে না।’ তবে তিনি চাইলেই পারেন বেশি করে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলাতে, ফিল্ডে খেলা রাখতে হবে, ক্লাবগুলোর সাথে আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে।

পাইপলাইন সমৃদ্ধ

ক্রিকেটের মতো হকিতেও অনূর্ধ্ব-১৫, ১৭, ১৯ দল তৈরি করা উচিত। এটা করতে পারলে আগামী ৮-১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের হকির চেহারাটা আমূল পাল্টে যাবে। চ্যালেঞ্জার কাপ জয়ী দল থেকে বয়সের কারণে ছিটকে যাবেন সাত থকে আটজন প্লেয়ার। তাহলে জুনিয়র দলের কী হবে। বিকেএসপির হকি কোচ শেখ মো: নান্নু আশ^স্ত করলেন, পাইপলাইনে প্রচুর খেলোয়াড় রয়েছে। দুই বছরে ২০ জনের মতো ভালো ক্যাটাগরির প্লেয়ার পাওয়া যাবে। এখনি হাতে আছে ১০-১২ জন। তন্মধ্যে সারার, তারেক, সজীব, শাওন, ইয়ামান, হুদাল্লিল, গোলরক্ষক হাবিব অন্যতম। আগামী দুই বছরে পূর্ণাঙ্গ টিম তৈরি হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ।

আমিরুলেরও বিকল্প আছে

কোচ নান্নু আরো জানালেন, বিকেএসপিতে যে চার পাঁচজন ড্রাগ অ্যান্ড ফ্লিকের জন্য অর্থাৎ পেনাল্টি কর্নারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল তন্মধ্যে আমিরুল ইসলাম ছিলেন সবচেয়ে দুর্বল। শেষ পর্যন্ত আমিরুলই টিকে গেছেন বাকিরা ঝরে গেছেন। নান্নু যোগ করেন, আমরা সাধারণত শুরুতে খেলোয়াড়দের বাইসেপ, ট্রাইসেপ, রিস্ট, পাওয়ার, ফ্লিক ইত্যাদি দেখে আলাদা করি এবং তাদের নিয়ে এক দেড় বছর কাজ করি। এরপর সংখ্যাটা কমিয়ে দুই তিনে নিয়ে এসে স্পেশাল ট্রেনিং দিয়ে থাকি। এখন আমাদের হাতে আছে শাওন, সারার, ইয়ামান, তারেক। তারাই হবে পরবর্তী চয়ন-আশরাফুল-আমিরুল।

এগিয়ে আসতে হবে ক্লাবগুলোকে

বাহফে সেক্রেটারির সাফ সাফ কথা, ফেডারেশন যথেষ্ট আন্তরিক এবং আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। হকির উন্নয়নে একপায়ে খাড়া। অর্থাভাব রয়েছে সেটা স্বাভাবিক। এটাও হয়তো ফুলফিল হয়ে যাবে। কিন্তু যাদের বড় অবদান রয়েছে সেই ক্লাবগুলোকে সবার আগে প্লেয়ারদের কথা ভাবতে হবে। যেখান থেকে তাদের ইনকাম হবে, নিজে চলবে পরিবারকে চালাবে। ক্লাবগুলো সহযোগিতা করলে প্লেয়ারদের গতি হবে। আমার চাওয়া ক্লাবগুলো অতীতের সবকিছু ভুলে বিশ^কাপে আলো ছড়ানো মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে লিগের ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

বিদেশী কোচে আস্থা, অন্তরায় টাকা

বাংলাদেশ হকির প্রধান ডাচ কোচ সেইগফ্রেড আইকম্যান নিসঙ্গতার কথা জানিয়ে বলেছে তিনি আর কন্টিনিউ করছেন না। অথচ খেলোয়াড়রা তার ভক্ত হয়ে গেছেন। এটা স্পষ্ট তিনি তার ফ্যামিলিকে এখানে চাচ্ছেন। এমনিতেই তার খরচা উঠাতে হিমশিম খাচ্ছে ফেডারেশন আইকম্যানের পরিবারের খরচা উঠাতে অপারগ। পাকিস্তানে এসএ গেমস উপলক্ষে বিওএর খরচায় তাকে আনা হয়েছিল। গেমস স্থগিত হওয়ায় এখন কে খরচা দেবে সেটিও একটা বড় বিষয়। সে হিসাবে খেলোয়াড়দের আস্থা থাকা সত্ত্বেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এখানেই ইতি ঘটবে এই ডাচ কোচের।