নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা

৩০ জেলায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পাশাপাশি ত্রিমুখী সংঘর্ষ

৪ জনের মৃত্যু ও ১ নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ

এস এম মিন্টু
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় ৩০ জেলায় অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এসব সহিংসতায় আহত হয়েছেন তিন শতাধিক। নির্বাচনের পরদিন নোয়াখালীর হাতিয়ায় ‘শাপলাকলিতে’ ভোট দেয়ায় এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ওই নারী আদালতে মামলা করার পর মামলাটি পুলিশ তদন্ত করছে। গোয়েন্দা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী ৩০টি জেলায় এসব সহিংসতার অধিকাংশ ঘটনায় বিএনপির প্রার্থীর সাথে বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্ঘাতের ঘটনা বেশি ঘটেছে। পাশাপাশি বিএনপির সাথে জামায়াত ও এনসিপির ত্রিমুখী সঙ্ঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। এ বিষয়ে পুুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী যারা সহিংসতায় জড়িয়েছে তারা কারা? নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার পরও কেন সহিংসতার ঘটনা ঘটবে। যারা ঘটিয়েছে তারা সবাই নিজেদের লোক। আইজিপি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নিজেরা নিজেরা বা ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি করলে পুলিশের কি সম্ভব এগুলো প্রতিহত করা। তিনি বলেন, নির্বাচন শেষ হয়েছে। এখন আর কোনো সহিংসতা বরদাস্ত করা হবে না। এখন থেকে পুলিশের কাজ পুলিশ করবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যা প্রয়োজন তাই করবে পুলিশ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় দলটির যারা সম্পৃক্ত হবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

শাপলাকলিতে ভোট দেয়ায় ধর্ষণের অভিযোগ : নোয়াখালীর হাতিয়া চাননন্দী ইউনিয়নে শাপলাকলি প্রতীকে ভোট দেয়ার জেরে স্বামীকে বেঁধে রেখে তিন সন্তানের জননীকে (৩২) ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী নারী স্থানীয় নলেরচর একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার রাত ১১টায় তিন ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করে। এদের মধ্যে দু’জন দরজায় পাহারায় ছিল, আর একজন তাকে ধর্ষণ করে। এ সময় তার স্বামীকে বেঁধে রাখা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। ওই নারীর অভিযোগ, তিনি নির্বাচনে ‘শাপলাকলি’ প্রতীকে ভোট দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই হামলা চালানো হয়েছে।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা: ফরিদ উদ্দিন জানান, (১৪ ফেব্রুয়ারি) শনিবার বেলা ২টার দিকে হাতিয়া উপজেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করা এক মধ্যবয়সী নারী হাসপাতলে আসেন। তিনি জানান, তাকে ওই দিন (শনিবার) সকাল ৬টায় শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এরপর তিনি চলে যান। পরে বিকেলে এসে বলেন, তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) টি এম মোশাররফ হোসেন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ভুক্তভোগী নারী আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেছেন। ওই নারীর মেডিক্যাল পরীক্ষা হয়েছে। মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ না হওয়ায় বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।

ময়মনসিংহ ও মুন্সীগঞ্জে শিশুসহ নিহত ২ : নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে সহিংসতায় বিএনপি কর্মীর এক শিশুসন্তান নিহত হয়েছে। শিশুটি স্বদেশী ইউনিয়নের বাউশা গ্রামের বিএনপির কর্মী দুলাল মিয়ার ছেলে ইমন (১২)। নিহত ইমনের বাবা দুলাল মিয়া বলেন, আমাকে একই এলাকার স্বতন্ত্র প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের কর্মী আতাহার ধানের শীষের নির্বাচন করতে নিষেধ করার পরও আমি নির্বাচন করায় নির্বাচনের পরের দিন শুক্রবার বিকালে আমার ছেলেকে সুপারি চুরির অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের চর আব্দুল্লাহ গ্রামে বিএনপি সমর্থক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ফুটবল প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে হামলা ও পালটা হামলায় মো: জসিম নায়েব (৩৫) নামের একজনের মৃত্যু হয়। নির্বাচনের পরদিন বিকেলে সংঘর্ষে গুরুতর আহত জসিমকে রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহত জসিম চর আব্দুল্লাহ গ্রামের মাফিক নায়েবের ছেলে। ওই ঘটনায় তার বাবা মাফিক নায়েব ও বড় ভাই মো: মোখলেছও আহত হয়েছেন।

নির্বাচনের আগে থেকেই ধানের শীষ সমর্থক নাসির ডাক্তার ও শওকত আলী সরকারের সাথে স্থানীয় মাফিক নায়েবের বিরোধ চলছিল। পূর্বের বিরোধের জেরে দুই পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেন। নিহত জসিম ও তার পরিবার ফুটবল প্রতীকের পক্ষে এবং নাসির ও শওকতরা ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে কাজ করেন। নিহতের পরিবারের দাবি, শুক্রবার মাফিক নায়েবের বাড়িতে ককটেল হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। বাধা দিতে গেলে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় নাসির দেওয়ান ও তার লোকজন জসিমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মেনহাজুল আলম গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, এটা নির্বাচনী সহিংসতা নয়। মূলত দুই পরিবারের মধ্যে পুরনো শত্রুতা ও তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। সেদিন পুলিশ, র‌্যাব বিজিবিসহ অন্যন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরো ভয়ঙ্কর হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তিনি বলেন, এ ঘটনায় দু’জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। আমরা আরো দু’জনকে খুঁজছি।

বাগেরহাটে যুবক নিহত : বাগেরহাটের কচুয়ায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ওসমান সরদার (২৯) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ এইচ সেলিমের সমর্থকদের সাথে কচুয়ার ধোপাখালী ইউনিয়নের ছিটাবাড়ি গ্রামে ধানের শীষের প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

নিহত ওসমানের বড় ভাই এনামুল কবির সরদার নয়া দিগন্তকে বলেন, ধানের শীষের সমর্থকরা ঘোড়া প্রতীকের লোকজন কই গেল বলে খুঁজছিল। এর মধ্যে আমার ভাইয়ের ওপর হামলা চালায় তারা। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে একজনকে গ্রেফতার করে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারের জন্য একটি টিম গঠন করা হয়েছে। অপরাধী যে বা যে দলেরই হোক তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

বাগেরহাট জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো: আবু রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, জেলা ডিবি ও সদর পুলিশের সমন্বয়ে একটি টিম আসামিদের গ্রেফতারে মাঠে কাজ করছে।

জানা গেছে, নিহত ওসমান সরদার সদর উপজেলার পাড় নওয়াপাড়া গ্রামের শাহজাহান সরদারের ছেলে। ওসমান ঢাকায় একটি সিকিউরিটি কোম্পানিতে কাজ করতেন। নিহতের চাচা আবুল কালাম বলেন, আমার ভাতিজা কোনো রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি ঢাকায় চাকরি করেন। ভোট দিতে এসেছিলেন। পচা রাজনীতির বলি হয়েছে আমার ভাতিজা। দুই দলের গোলমালের মধ্যে পড়ে সে মারা গেছে। সামাজিক অবক্ষয় আর পচা রাজনীতির কারণে ভাতিজাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

ভোলায় বিএনপির ২ পক্ষের বিরোধে ১ জনকে হত্যা : নির্বাচনের পর ভোলার চরফ্যাসনে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে শশীভূষণ থানাধীন রসুলপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কলেরহাট রাস্তার মাথায় আবদুর রহিম (৪৫) নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি একসময় যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তাকে হত্যার আগের দিন তার ছেলেকে পিটিয়ে আহত করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা এবারের জাতীয় নির্বাচনে ভোলা-৪ আসনে (মনপুরা ও চরফ্যাসন উপজেলা) জয়ী বিএনপির প্রার্থী নুরুল ইসলামের (নয়ন) অনুসারী বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, নিহত আবদুর রহিমের পরিবারের অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তারা সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা নাজিম উদ্দিনের (আলম) অনুসারী। কিন্তু ভোলা-৪ আসনে এবারের নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়ন চেয়েও পাননি। বিএনপির প্রার্থী হয়ে আসনটিতে জয় পেয়েছেন নুরুল ইসলাম। স্থানীয় বিএনপিতে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ভোলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো: শহিদুল্লাহ কাওসারের নম্বরে কল দিলে তিনি কল রিসিভ করেননি।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এ পর্যালোচনায় নির্বাচন-পরবর্তী দুই দিনে ৩০টি জেলায় দুই শতাধিক সহিংসতার ঘটনার কথা জানিয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী নিহত হয়েছে তিনজন, আহত তিন শতাধিক।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক এজাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী দুই দিনে ৩০টি জেলায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সহিংসতায় মুন্সীগঞ্জ ও বাগেরহাটে দুই যুবক নিহত হন। আর ময়মনসিংহে নিহত হয় এক শিশু। এ ছাড়া নোয়াখালীতে একটি ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব সহিংসতার ঘটনায় বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা জড়িত। নির্বাচন পরবর্তী এসব সহিংসতায় ৩৫০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, ঘরবাড়িতে হামলা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।