যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় ইসরাইলি হামলা, শিশুসহ নিহত ২৯

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত বেড়ে ৭১,৭৬৯
  • রাফাহ ক্রসিং খুলছে ইসরাইল তবে চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ
  • পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়ছে

গাজা উপত্যকায় ভোর থেকে চালানো ইসরাইলি হামলায় অন্তত ২৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ছয়টি শিশু রয়েছে বলে চিকিৎসা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আলজাজিরা। গাজা সিটি ও দক্ষিণের খান ইউনুস এলাকায় এসব হামলা চালানো হয়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও চিকিৎসা সূত্র জানায়, ১০ অক্টোবর ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে নির্ধারিত ইসরাইলি সেনা মোতায়েন এলাকার বাইরে এসব হামলা চালানো হয়েছে। এতে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ আরো জোরালো হয়েছে। গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকায় একটি পুলিশ স্টেশনে ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৯ জনে দাঁড়িয়েছে বলে আল-শিফা হাসপাতালের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই হামলাই আজকের মোট নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল আলজাজিরাকে বলেন, আজকের হামলাগুলোতে নিহতদের বেশির ভাগই শিশু। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি বাহিনী শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যার ফলে লক্ষ্যবস্তু এলাকায় ব্যাপক ধ্বংস ও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে। এই সহিংসতা এমন এক সময় ঘটল, যখন আগামী রোববার প্রায় এক বছর পর গাজা ও মিসরের মধ্যকার রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং আবার খোলার কথা রয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসের পর এই প্রথম সীমান্তটি আংশিকভাবে চালু হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ধারাবাহিক হামলা গাজায় নতুন করে উদ্বেগ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত বেড়ে ৭১,৭৬৯ : গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সামরিক হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭১ হাজার ৭৬৯ জনে পৌঁছেছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি অভিযানে এখন পর্যন্ত আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ৪৮০ জনের বেশি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, নিহতদের তালিকায় বিচারিক কমিটির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া আরো ৮৫ জন ফিলিস্তিনিকেও যুক্ত করা হয়েছে।

গাজার সরকার অভিযোগ করেছে, যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে ইসরাইল একদিকে হামলা চালাচ্ছে, অন্য দিকে মানবিক সহায়তা ও জ্বালানি প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির ১১১ দিনে গাজায় প্রবেশের কথা ছিল ৬৬ হাজার ৬০০টি ত্রাণ, বাণিজ্যিক ও জ্বালানি বহনকারী ট্রাক। কিন্তু বাস্তবে প্রবেশ করেছে মাত্র ২৮ হাজার ৯২৭টি, যা মোট প্রতিশ্রুতির মাত্র ৪৩ শতাংশ। বিশেষ করে জ্বালানির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। নির্ধারিত পাঁচ হাজার ৫৫০টি জ্বালানি ট্রাকের বিপরীতে গাজায় প্রবেশ করেছে মাত্র ৭৮২টি, যা মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ।

রাফাহ ক্রসিং খুলছে ইসরাইল, তবে চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ

দীর্ঘ আট মাস পর গাজা ও মিসরের সংযোগস্থল রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং আংশিকভাবে ফের খোলার ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইল। রোববার থেকে এই ক্রসিং চালু হওয়ার কথা থাকলেও মানুষের চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। খবর আলজাজিরার। ইসরাইল জানিয়েছে, শুধু নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই সীমান্ত পারাপারের অনুমতি পাবেন। কোনো মানবিক সহায়তা বা পণ্যবাহী যান চলাচলের অনুমতি দেয়া হবে না। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, “গত দুই বছরে যারা গাজা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কেবল তারাই ফিরতে পারবেন।”

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়ছে

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ধারাবাহিক হামলায় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো বাস্তুচ্যুত হচ্ছে বলে ওয়াফা সংবাদ সংস্থার বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। জেরিকোর উত্তরে আল-আউজা গ্রাম থেকে এক বেদুইন পরিবারকে জোরপূর্বক উৎখাত করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, শালাল আল-আউজা এলাকার ওই পরিবারটি এক সপ্তাহ আগে আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র গেলেও, ফের বসতি স্থাপনকারীদের হামলার মুখে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। আল-বাইদার মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, চলমান হয়রানির কারণে এ পর্যন্ত ডজনখানেক পরিবার এলাকা ছেড়েছে। এ দিকে হেবরনের বাব আল-জাওয়িয়া এলাকায় একটি কথিত প্রতœতাত্ত্বিক স্থানে বসতি স্থাপনকারীদের অনুপ্রবেশের নিরাপত্তা দিতে দোকানপাট বন্ধ ও বাসিন্দাদের সরিয়ে দেয় ইসরাইলি বাহিনী।

গাজায় ইসরাইলের মৃত্যু অস্বীকারের দীর্ঘ ইতিহাস

দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা গাজা যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন অস্বীকৃতি ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর পর অবশেষে ইসরাইলি সেনাবাহিনী গাজায় প্রায় ৭০ হাজার মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করেছে। বৃহস্পতিবার এক ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধে গাজায় আনুমানিক ৭০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। খবর আলজাজিরার। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭১ হাজার ৬৬২ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ৪৮৮ জন নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পরিসংখ্যানকে বিশ্বাসযোগ্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তবে ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগ যে বেসামরিক মানুষ-বিশেষ করে নারী ও শিশু, তা স্বীকার করেনি। যুদ্ধের সময় ইসরাইল নিয়মিতভাবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা বলে দাবি করে এসেছে এবং নিজস্ব হিসাব বারবার পরিবর্তন করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। ২০২৫ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে ইউরো-মেড মনিটর। গাজার পাঁচ বছরের শিশু হিন্দ রাজাব, সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ এবং জরুরি সেবাকর্মীদের হত্যার ঘটনায় প্রথমে দায় অস্বীকার করলেও পরে ইসরাইল ধীরে ধীরে অবস্থান পরিবর্তন করেছে, যা দেশটির দীর্ঘদিনের ‘ডিনায়ালিজম’-এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

গাজাকে ‘বধ্যভূমি’ আখ্যা দেয়া মার্কিন সতর্কবার্তা আটকে দেন দূতরা

২০২৪ সালের শুরুতে গাজার উত্তরাঞ্চলকে একটি প্রলয়ঙ্কর ধ্বংসভূমি হিসেবে বর্ণনা করে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) একটি গোপন কূটনৈতিক বার্তা ওয়াশিংটনে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেন ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জ্যাক লিউ ও তার ডেপুটি স্টেফানি হ্যালেট। রয়টার্সের অনুসন্ধানে প্রথমবারের মতো বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। ইউএন কর্মীদের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে পরিচালিত একটি মানবিক অনুসন্ধান মিশনের ওপর ভিত্তি করে ওই বার্তায় গাজার রাস্তায় পড়ে থাকা মানবদেহের হাড়, পরিত্যক্ত গাড়িতে লাশ, চরম খাদ্যসঙ্কট ও নিরাপদ পানির ভয়াবহ অভাবের বিবরণ দেয়া হয়েছিল। এতে বলা হয়, গাজায় মানবিক প্রয়োজন এখন ‘বিপর্যয়কর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু দূতাবাস কর্তৃপক্ষ বার্তাটিকে ‘ভারসাম্যহীন’ বলে উল্লেখ করে তা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অভ্যন্তরীণ বিতরণ থেকে আটকে দেয়।