তিন দিন লাশের অপোয় ছিল পরিবার, এখন ন্যায়বিচারের প্রতীা

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

মাত্র ২৮ বছর বয়সেই থেমে যায় আকরাম খান রাব্বির জীবন। রাজধানীর ক্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থী ওই তরুণ পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করে সংসারে সহযোগিতা করতেন। জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের জন্য নিজের টাকায় পানি ও খাবার কিনে দিয়েছিলেন। ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ এলাকায় আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে প্রথমে তার হাতে, পরে বুকে গুলি লাগে। মৃত্যুর পরও তিনদিন লাশ বুঝে পায়নি পরিবার। শেষবারের মতো ছেলের মুখও দেখতে পারেননি মা। দুই বছর পরও সেই শোকের সাথে ন্যায়বিচারের অপোয় দিন গুনছেন স্বজনরা। তাদের দাবি, নিরপে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

১৯ জুলাই শুক্রবার। রাজধানীর মিরপুর-১০ ও গোলচত্বর এলাকা তখন সংঘর্ষে উত্তাল। পরিবার ও প্রত্যদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছুড়ছিল। শহীদ আবু তালেব স্কুলের সামনে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করছিলেন। তাদেরই সামনের সারিতে ছিলেন আকরাম খান রাব্বি। ক্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিার্থী শুধু আন্দোলনে অংশই নেননি, শুরু থেকেই নিজের বেতনের টাকা দিয়ে আন্দোলনকারীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতেন। আগের দিনও বাসায় ফিরে বাবা-মাকে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানোর গল্প শুনিয়েছিলেন।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯ জুলাই জুমার নামাজ আদায় করে রাব্বি মিরপুর-১০ এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দেন। বিকেল ৪টা ১৭ মিনিটের দিকে শহীদ আবু তালেব স্কুলের সামনে আন্দোলনকারীদের সাথে অবস্থানকালে প্রথমে তার হাতে গুলি লাগলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। এ সময় পরে তার বুকে গুলি করা হয়। এতে তিনি রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েন।

সহযোদ্ধারা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মিরপুর-১১-এর ইসলামিয়া হাসপাতালে নেয়। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে গিয়ে বাবা ফারুক খান দেখেন, রক্তমাখা পোশাক পরা ছেলের নিথর দেহ মেঝেতে পড়ে আছে।

কিন্তু ছেলের মৃত্যুর পরও পরিবারের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। ফারুক খানের অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপ ‘ঊর্ধ্বতন নির্দেশের’ কথা বলে লাশ বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তিনি লাশ হিমঘরে রাখার জন্য অর্থ জমা দিলেও পরদিন গিয়ে দেখেন লাশ বাইরে পড়ে আছে। পরিবারের দাবি, তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকার কারণে তারা তিন দিন ধরে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট দফতরে ঘুরেও ছেলের লাশ পাননি। তাদের আশঙ্কা ছিল, লাশ গুম বা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। অবশেষে ২১ জুলাই প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে লাশে পচন ধরে এবং দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

ফুফু জানান, রাব্বি এমবিএ পরীা দিয়েছিল। জুমার নামাজ পড়ে জায়নামাজ হাতে নিয়েই মিছিলে গিয়েছিল। সে কোনো অপরাধ করেনি। কিন্তু পুলিশ প্রথমে তার হাতে গুলি করে মাটিতে পড়ে গেলে পরে পেটে গুলি করে। রাব্বির লাশ তিন দিন হাসপাতালের মর্গে আটকে রাখা হয়েছিল। পরে যখন লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তখন তা পচে গিয়েছিল। এমনকি ইসলামী বিধান অনুযায়ী গোসলও করানো সম্ভব হয়নি। একই দিন সন্ধ্যায় নামজে জানাজা শেষে মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশনের পূর্ব বাইশটেকি কবরস্থানে রাব্বিকে দাফন করা হয়।

পরিবারের অভিযোগ, সন্তানের শেষ বিদায়ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পারেননি তারা। জানাজার সময় পুলিশ সেখানে গিয়ে তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা করে। তবে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং পরে নামাজে জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

বাবা-মা বলেন, রাব্বি ছিল একজন দায়িত্বশীল সন্তান, যে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করে সংসারে সহযোগিতা করতেন। তাদের একমাত্র দাবি, ছেলের মৃত্যুর নিরপে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হোক, আন্দোলনে নিহত সবাইকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা দেয়া হোক এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর কখনো না ঘটে।