পাকিস্তান-ভারত ম্যাচটি শুধু ২২ গজে নয়

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition

নিশ্চিতভাবেই পাকিস্তান-ভারত ম্যাচ মানেই উত্তেজনার পারদ চড়ে যায়। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে ১৫ ফেব্রুয়ারির লড়াইটি শুধু ক্রিকেটীয় দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে ক্ষমতা, রাজনীতি ও প্রভাব বিস্তারের এক নগ্ন প্রদর্শনীতে। মাঠের বাইরের ঘটনাপ্রবাহ ম্যাচটিকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে ব্যাট-বলের লড়াইয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মানসিক চাপ, কূটচাল আর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

টি-২০ বিশ্বকাপে টানা দুই জয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় বাবর-শাদাবরা। ভারতও দুই ম্যাচ জিতে সামর্থ্যরে জানান দিয়েছে। পরের ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে পাকিস্তান-ভারত। এ ম্যাচে ইতিবাচক-আক্রমণাত্মক-আগ্রাসী ক্রিকেট খেলবে পাকিস্তান। এমনটিই জানালেন পাকিস্তানের ওপেনার সাহিবজাদা ফারহান। কম গেলেন না ভারতীয় অধিনায়ক সুরিয়া কুমার, ‘কাউকে কিছু বলতে হবে না। পরিসংখ্যানই সব কিছুর উত্তর দেবে। আমরা সমীকরণে পার্থক্য আরো বাড়াতে চাই।’

উত্তেজনার সূত্রপাত বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমানকে অকারণে আইপিএল দল থেকে বাদ দেয়ার ঘটনায়। বাংলাদেশ ভারতে গিয়ে খেলতে না চাওয়ার বিপরীতে ক্রিকেটীয় যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই বেশি কাজ করেছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই আইসিসি একতরফাভাবে স্কটল্যান্ডকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা বাংলাদেশের প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা ছাড়া কিছুই নয়। প্রশ্ন উঠেছে, আইসিসি নিরপেক্ষ ক্রীড়া সংস্থা না হয়ে নির্দিষ্ট একটি দেশের ইশারায় চলতে চাইল।

বাংলাদেশের প্রতি অবজ্ঞার পর দৃশ্যপটে আসে পাকিস্তান। তারা স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ঘোষণা দেয় বিশ্বকাপে অংশ নিলেও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলবে না। এ ঘোষণাই ছিল আসল ‘ট্রাম্প কার্ড’। এত দিন যারা ভাবছিল আইসিসি যা বলবে সেটাই চূড়ান্ত, তাদের ভ্রান্তি ভাঙে এখানেই। কারণ পাকিস্তান-ভারত ম্যাচ মানেই কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য, সম্প্রচার স্বত্ব, স্পন্সরশিপ আর বিজ্ঞাপনের পাহাড়। এই ম্যাচ বাতিল মানেই আইসিসির আর্থিক মেরুদণ্ডে বড় আঘাত।

ফলাফল চোখে পড়ার মতো। হঠাৎ করেই টনক নড়ে ভারতীয় প্রভাববলয়ে থাকা আইসিসির। বিশাল ক্ষতির আশঙ্কায় পাকিস্তানে জরুরি সভা ডাকা হয়। আলোচনার টেবিলে এবার আর হুমকি নয়, ছিল নমনীয়তা। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সব দাবিই মেনে নিতে বাধ্য হয় আইসিসি। এরপর পাকিস্তানকে রাজি করানো হয় ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে। এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায়, যা এত দিন ‘নিয়ম’ বলে চালানো হচ্ছিল, তা আসলে ছিল সুবিধাবাদী রাজনীতি।

এই পটভূমিতেই ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচ ঘিরে তৈরি হয়েছে উন্মাদনা। এটি আর শুধু দুই দলের লড়াই নয়। এটি মর্যাদা রক্ষার, মানসিক শক্তির আর আধিপত্যের পরীক্ষা। পাকিস্তান ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে তারা ভারতের বিপক্ষে খেলবে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট। এ ঘোষণার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের বার্তা। তারা বুঝিয়ে দিতে চায়, চাপের কাছে নত হওয়া তাদের রক্তে নেই।

অন্য দিকে ভারতও জানে, এই ম্যাচ হার মানেই শুধু পয়েন্ট হার নয়, বরং মাঠের বাইরে তৈরি হওয়া ‘প্রভাবশালী’ ভাবমূর্তিতে চিড় ধরা। ফলে দুই দলই নামবে প্রচণ্ড মানসিক চাপে। ভুলের সুযোগ থাকবে না, কারণ প্রতিটি বলেই জড়িয়ে আছে রাজনীতি, অহঙ্কার আর প্রতিশোধের গল্প।

সব মিলিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচ বিশ্বকাপের অন্য যেকোনো ম্যাচের চেয়ে আলাদা। এখানে জয়-পরাজয়ের হিসাব শুধু স্কোরবোর্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি প্রমাণ করবে, ক্রিকেট সত্যিই কার, খেলোয়াড়দের নাকি ক্ষমতাবানদের? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পুরো ক্রিকেটবিশ্ব তাকিয়ে থাকবে এই এক ম্যাচের দিকে।

এই মহারণ সবসময়ই বাড়তি উন্মাদনা যোগ করে দুই দেশের ভক্ত-সমর্থকদের মাঝে। যদিও পরিসংখ্যানে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে ভারতেরই আধিপত্য রয়েছে। টি-২০ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আট ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। এর সাতটিতেই জিতেছে ভারত। সব মিলিয়ে এই ফরম্যাটে ১৬ ম্যাচ খেলেছে দুই দল। ভারতের ১৩ জয়ের বিপরীতে পাকিস্তানের জয় মাত্র তিনটিতে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৭৩ রানের দারুণ ইনিংস খেলা পাকিস্তান ওপেনার সাহিবজাদা ফারহান বলেন, ‘আমরা একটি মানসিকতায় মাঠে নামব, ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপের ম্যাচসহ অন্যান্য ম্যাচে যে মানসিকতায় খেলেছি। আমরা চেষ্টা করব ইতিবাচক থাকতে, আক্রমণাত্মক ও আগ্রাসী ক্রিকেট খেলতে। এ ম্যাচকে ঘিরে অপেক্ষা করছে অনেক কিছুর হিসাব।’