ট্রাইব্যুনালে গুম ও নির্যাতনের রোমহর্ষক জবানবন্দী

দেয়াল টপকে মুখ চেপে ধরল, তারপর সাড়ে সাত মাস অন্ধকার ঘরে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার মানবতাবিরোধী অপরাধ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘গভীর রাতে মাদরাসার দেয়াল টপকে ১০-১৫ জন মাঠে ঢুকল। আমাকে জড়িয়ে ধরে মুখ চেপে বের করে নিয়ে গেল বাইরে অপেক্ষমাণ গাড়িতে। এরপর দু’হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ, চোখে কাপড় আর মাথায় জমটুপি পরিয়ে শুরু হলো এক অন্ধকার যাত্রা।’ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম এবং নির্মম নির্যাতনের বিবরণ দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এভাবেই চোখ ভেজানো জবানবন্দী দিয়েছেন ভুক্তভোগী হেফাজত কর্মী মো: তাজুল ইসলাম সুমন (৩৯)।

গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দী দেন। ট্রাইব্যুনালে গতকালের শুনানিতে এই মামলায় গ্রেফতার থাকা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহা পরিদফতরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকীকে কঠোর নিরাপত্তায় হাজির করা হয়।

ফরিদপুরের সালথা থানার বাসিন্দা এবং মানিকগঞ্জের দারুল উলুম মাদরাসার তৎকালীন শিক্ষক তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে জানান, বিগত সরকারের জুলুম ও হেফাজতে ইসলামের ওপর চালানো সহিংসতার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখির কারণে ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর তাকে কর্মস্থল থেকে গুম করা হয়। তিনি জানান, ওই দিন বেলা ১১টার দিকে দু’জন অজ্ঞাত ব্যক্তি সন্তান ভর্তির কথা বলে মাদরাসার পরিচালকের কক্ষে আসে এবং তার সাথেও কথা বলে। তারা নিজেদের গ্রামীণফোনের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ঢাকা থেকে বদলি হয়ে আসার গল্প ফাঁদে এবং মোবাইল নম্বর নিয়ে যায়।

এরপর সেই রাতেই আনুমানিক রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে তারা ফোনে জানায় যে, তারা ঢাকা চলে যাবে এবং তাদের স্ত্রী সরাসরি শিক্ষকের সাথে কথা বলতে চান। তাজুল এত রাতে বাইরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে তারা তাকে মাদরাসার মাঠে আসতে বলে। তাজুল দোতলা থেকে মাঠে নামামাত্রই ওঁৎ পেতে থাকা ১০-১৫ জন দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে তার মুখ চেপে ধরে বাইরে নিয়ে যায়। বাইরে আরো তিনটি গাড়ি এবং ১০-১২ জন লোক অবস্থান করছিল। গাড়িতে তোলার পর থেকেই তার দু’হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ ও চোখে কাপড় বেঁধে শুরু হয় পাসওয়ার্ড ও তথ্য উদ্ধারের জন্য নির্যাতন।

জবানবন্দী অনুযায়ী, প্রায় আড়াই ঘণ্টা গাড়ি চলার পর একটি কেঁচিগেট খোলার শব্দ শুনতে পান ভুক্তভোগী। তাকে একটি সিঁড়ির উপরে উঠিয়ে পাঁচ-সাত কদম সামনে নিয়ে একটি টুলের ওপর বসানো হয়। সেখানে তার ফেসবুক ও জিমেইল আইডি-পাসওয়ার্ড চাওয়া হয় এবং কিছু নাম উল্লেখ করে চেনার জন্য চাপ দেয়া হয়। অস্বীকৃতি জানালে কাঁধে, বাহুতে এবং পায়ের রানে লাঠি দিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। এরপর অন্য রুমে নিয়ে চোখ খুলে ছবি তুলে তার পোশাক (লুঙ্গি, গেঞ্জি, জুতো) কেড়ে নিয়ে অন্য একটি গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরানো হয়।

৮ বাই ১১ ফুটের সেই অন্ধকার রুমে একটি খাটিয়া, দু’টি কম্বল, একটি বালিশ ও একটি পেশাবের পট ছিল। রুমে একটি স্বাভাবিক লাইটের পাশাপাশি এক হাজার পাওয়ার ভোল্টের একটি তীব্র লাইট জ্বালিয়ে রাখা হতো। তাজুল ইসলাম জানান, ‘উক্ত রুমে আমাকে আনুমানিক সাড়ে সাত মাস আটকে রাখা হয়। প্রথম চার মাসে আমাকে ২০ থেকে ২৫ দিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাশের কক্ষে নিয়ে চেয়ারের সাথে বেঁধে লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হতো এবং জোরপূর্বক জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হতো।’

সেই স্থানটি শনাক্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঐ রুমে থাকা অবস্থায় আমি কাফরুল মসজিদের মাইকের আওয়াজ শুনতে পেতাম এবং স্থানীয় লোকজনের মৃত্যুর সংবাদ প্রচারের সময় ‘পূর্ব কাফরুল’ এলাকার নাম উল্লেখ করা হতো। মাঝে মাঝে বিমান ওঠা-নামার আওয়াজও পেতাম। যখনই মাইকে কোনো এলান হতো, তখনই সেন্ট্রিরা একটি বড় একজস্ট ফ্যান চালু করে দিত, যাতে বাইরের আওয়াজ আমি শুনতে না পাই। টয়লেটে নেওয়ার সময়ও চোখ-হাত বাঁধা থাকত।’ সেখানে থাকা অবস্থায় পাশের বন্দী নাজিম উদ্দিন এবং ২০১৬ সালের ১ রমজান তার রুমে আনা খাগড়াছড়ির শামিম নামে এক বন্দীর সাথে ১৪ দিন থাকার কথা জানান তিনি।

২০১৬ সালের ১৫ রমজান তাজুলকে পুনরায় চোখ-মুখ বেঁধে ৪০ মিনিটের মতো গাড়ি চালিয়ে একটি টাইলস করা রুমের কর্নারে জলপাই রঙের কাপড় দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়। সেখানে ৪০ দিন রাখার পর একদিন স্থানান্তরের সময় কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন, ‘এটা কোনটা?’ অন্যজন উত্তর দেয়, ‘এটা পুরাতন।’ তখন একজন জিজ্ঞেস করে, ‘স্যার সিএফ কখন হবে?’ ভুক্তভোগী জানান, ‘সিএফ’ মানে যে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড তা তিনি পরবর্তী সময়ে কারাগারে গিয়ে বুঝতে পারেন।

এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় আরেকটি বিল্ডিংয়ের দোতলার কক্ষে, যেখানে তাকে একটি হাফপ্যান্ট পরিয়ে চার মাস রাখা হয়। সেখানে মাগুরার রাজীব, নূরে আলম ও আলামিন নামে আরো তিনজন বন্দীর সাথে তাকে একসাথে খাবার দেয়া হতো। ৪ ফিট বাই ৮ ফিটের সেই রুমগুলোর সামনে একটি বড় জিএফসি ফ্যান ছিল, যার পাদানিতে ‘র‌্যাব-৪’ লেখা ছিল এবং জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে র‌্যাব-৪-এর গাড়ি দেখা যেত।

চার মাস পর তাকে পুনরায় চোখ বেঁধে তিন ফিট বাই ছয় ফিটের একটি কমোডযুক্ত টয়লেট আকৃতির রুমে রাখা হয়, যার সামনে সিসি ক্যামেরা ছিল। সেখানে তার ডানে নূরে আলম, বামে আবু জর এবং বিপরীতে ইবতেসাম সামি ও নাজিম উদ্দিন ছিলেন। এটি ‘র‌্যাব-১০’-এর কার্যালয় ছিল বলে তিনি জানতে পারেন।

পরদিন সকালে সাত-আট ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে তাদের আরেকটি টয়লেটের মতো সিসি ক্যামেরাযুক্ত রুমে নিয়ে আট দিন রাখা হয়। অবশেষে ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর তাজুল ও নাজিম উদ্দিনকে গাড়িতে তুলে চট্টগ্রাম আকবর শাহ থানার কর্নেল হাট এলাকায় সানজিদা এন্টারপ্রাইজের সামনে নামিয়ে একটি ‘অস্ত্র উদ্ধারের নাটক’ সাজানো হয়। ১০-১৫ মিনিট পর একটি নির্মাণাধীন ভবনের দোতলায় নিয়ে সেখানে আগে থেকে বন্দী নূরে আলম, ইবতেসাম সামি ও আবু জরকে হাজির করা হয়। আশপাশে র‌্যাবের হুইসেল বাজিয়ে তিন-চার ঘণ্টা ধরে ‘জঙ্গি নাটক’ মঞ্চস্থ করার পর গভীর রাতে সাংবাদিকদের সামনে এনে তাদের আকবর শাহ থানায় সোপর্দ করা হয়।

৯ ডিসেম্বর আদালতে হাজির করে তাদের জেলে পাঠানো হয়। জেলে থাকা অবস্থায় পুলিশ ও র‌্যাবের অধীনে দুই দফায় রিমান্ডে নেয়া হলে, র‌্যাবের তৎকালীন এএসপি রুহুল আমীন তাদের জানান যে, তাদেরকে মূলত রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই তুলে এনেছিল। তৎকালীন র‌্যাব-৭-এর সিও কর্নেল মিফতাহর নির্দেশে এই সম্পূর্ণ জঙ্গি নাটকটি সাজানো হয়েছিল। তাদের নামে সন্ত্রাস দমন ও অস্ত্র আইনে মোট তিনটি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ আট বছর কারাগারে থাকার পর ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্তি পান। ইতোমধ্যে একটি মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন এবং বাকি দু’টি এখনো চলমান।

জবানবন্দীর শেষ অংশে ভুক্তভোগী তাজুল ইসলাম সুমন ট্রাইব্যুনালের কাছে জোরালো দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমার এই দীর্ঘ গুম, অমানুষিক নির্যাতন, মিথ্যা মামলা এবং আট বছরের জীবন ধ্বংসের সাথে যারা জড়িত বিশেষ করে শেখ হাসিনা, তার সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকী এবং তৎকালীন ডিজিএফআই ও র‌্যাবের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর বিচার চাই। আগামী ২২ জুন এই সাক্ষীর জেরার জন্য দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

জেআইসিতে গুমের এই মামলায় মোট ১৩ জন আসামি রয়েছেন। এর মধ্যে গতকাল তিন সাবেক পরিচালককে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলেও বাকি ১০ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিদের মধ্যে আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক- লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব:) মো: সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব:) হামিদুল হক।

পলাতক আসামিদের মধ্যে আরো আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মখছুরুল হক।

এ ছাড়া পলাতক আছেন আসামি গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক।