নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকার অভিযোগ ১১ দলীয় জোটের

প্রশাসনের বিরুদ্ধে একটি দলের দিকে ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ জামায়াত-এনসিপির

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে মনে করছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট। তারা এটাকে স্ষ্ঠুু নির্বাচনের অন্তরায় হিসেবে মনে করছে। এমনকি এই পরিস্থিতি বহাল থাকলে আওয়ামী লীগ আমলের মতো ভোটের ফলাফল আগেই নির্ধারণ করে পরে সে অনুযায়ী ঘোষণা করা হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানাচ্ছেন জোটের নেতারা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের পতনের দেড় বছর পর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আওয়ামী আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সম্পূর্ণ প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত ভোট হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে আমলা ও পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরা হয়। সে নির্বাচনে বিএনপিকে দেয়া হয় মাত্র সাতটি আসন। আর ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ভোট বয়কট করলে ‘আমি আর ডামি’র নির্বাচন করে শেখ হাসিনার সরকার। এরপর ছাত্র জনতার গণবিপ্লবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। মূলত আওয়ামী আমলে প্রতিটি নির্বাচনই ছিল পাতানো ও ফল আগে থেকেই নির্ধারিত। এ জন্য ধীরে ধীরে জনরোষ চরম পর্যায়ে পৌঁছলে একপর্যায়ে সরকারের পতন ঘটে।

ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন পরবর্তী রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে বেশকিছু বিষয় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। যাতে ভবিষ্যৎ সরকার হাসিনার মতো ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে। কিন্তু বর্তমানের রাজনীতি আগের ধাঁচেই চলমান থাকায় জনমনের সে প্রত্যাশা অনেকটাই ফিকে হতে শুরু করেছে। হত্যা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আগের মতোই বহাল রয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। আগের মতোই অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে সর্বত্র। ক্ষমতাসীনদের কাছে থাকতে মরিয়া দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা।

সম্প্রতি নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন বাছাইকে কেন্দ্র করে সে চিত্র অনেকটাই প্রকাশ হয়ে পড়েছে। এ জন্য নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকার অভিযোগ করছেন জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপিসহ ১১ দলের নেতারা। আগামীর নির্বাচনে মূলত বিএনপি জোট বনাম জামায়াত জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাচ্ছে। তাতে জামায়াত জোটে থাকা দলগুলো সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের কাছ থেকে সমান সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।

গত বুধবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে এ বিষয়ে অভিযোগ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মো: তাহের গণমাধ্যমকে বলেন, মনোনয়ন বাছাইয়ে একই আইনে দুই রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিছু রিটার্নিং অফিসার। বিভিন্ন জায়গায় দলীয় ডিসি নিয়োগ করা হয়েছে এবং তারা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন, আইনকে দেখেননি। আমরা বলেছি- এ ধরনের ডিসি, এসপি যারা আছে তাদের অপসারণ করতে হবে। নিরপেক্ষ ডিসি, এসপি সেখানে নিয়োগ করতে হবে, তা না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। অন্য একটা দলকে ব্যাপক প্রচারণার সুযোগ দিচ্ছে। কোনো কোনো ব্যক্তিকে অনেক প্রটেকশন দেয়া হচ্ছে। আবার একই পর্যায়ের অন্য নেতাদেরকে সে রকম প্রটেকশন দেয়া হচ্ছে না। এসব বিষয় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠকেও একই ধরনের অভিযোগ করে বলা হয়, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা প্রমাণ করে প্রশাসন কারো এক দিকে ঝুঁকে পড়ছে- যা কিছুতেই কাম্য নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়। এই প্রবণতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে একই রকম অসন্তোষের কথা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে আমাদের এখন পর্যন্ত আত্মবিশ্বাস নেই। একটি বিশেষ দলকে সুবিধা দিতে সিগন্যালিং করা হচ্ছে। এতে মানুষের কাছে ভিন্ন বার্তা যায়। নাহিদ অভিযোগ করেন, অনেক ঋণখেলাপির মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। নানাভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন এখনো নির্বিকার। আশা করি তারা দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

জামায়াত জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ইসলামী আন্দোলনের আমির চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম গতকাল দলটির একটি বৈঠকে বলেছেন, নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড জরুরি। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড একটি বহুমাত্রিক বিষয়। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোভাব, ঝোঁক ও প্রবণতা নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে প্রভাব বিস্তার করে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে সুষ্ঠু নির্বাচন করার মতো কাক্সিক্ষতমানের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিদ্যমান নাই। আমরা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছি। তিনি আরো বলেন, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় কোনো কোনো রিটার্নিং অফিসারের আচরণ আমাদের চিন্তিত করেছে।

জোটের আরেক অংশীদার খেলাফত মজলিসের নেতারা মনে করছেন প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করলে এবারের নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দলটির নির্বাহী সভায় নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ভোট গ্রহণের দিন যত ঘনিয়ে আসছে একটি বিশেষ দলের প্রতি প্রশাসনের ঝোঁক বাড়ছে। এতে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ বিনষ্ট এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

অন্য দিকে খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের গতকালের বৈঠকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকায় ও একটি বড় দলের প্রতি সরকারের দুর্বলতায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। নেতারা বলেন, নির্বাচনে ভোটারদের নির্বিঘেœ ভোটাধিকার প্রদানের পরিবেশ এবং সব দলের প্রার্থীদের সমান অধিকার নিশ্চিত না হলে আগের নির্বাচনের মতো এ নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।

তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ২৪ গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তীতে সব দলের সমান অধিকার হবে- এটাই ছিল দেশবাসীর আকাক্সক্ষা। কিন্তু আমরা লক্ষ করছি- একটি বড় দল ও তার নেতাদের প্রতি বর্তমান সরকারের বিশেষ দুর্বলতা কাজ করছে। জামায়াত জোটে থাকা অন্য দলগুলোর নেতারাও নির্বাচনে লেভেল ফিল্ড না থাকার অভিযোগ করে এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।