পর্দা নামল ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের

সর্বোচ্চ সম্মাননা জিতল ‘ফিয়র্ড’ সিনেমা

Printed Edition
কান চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে বিচারক ও বিজয়ীরা : নয়া দিগন্ত
কান চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে বিচারক ও বিজয়ীরা : নয়া দিগন্ত

ফ্রান্স প্রতিনিধি

ফ্রান্সের দক্ষিণ উপকূলীয় শহর কানের ঐতিহাসিক গ্রাঁ থিয়াত্র লুমিয়ের প্রেক্ষাগৃহে গত শনিবার সন্ধ্যায় জাঁকজমকপূর্ণ সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের। দুই সপ্তাহব্যাপী এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে তারকাদের সরব উপস্থিতি, দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ব্যাপক মনোযোগ মিলিয়ে কান যেন আরো একবার প্রমাণ করল- বিশ্ব সিনেমার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে তার আসন অটুট।

সমাপনী রাতের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্তে সর্বোচ্চ সম্মাননা পাম দ’অর জিতে নিলেন রোমানিয়ার খ্যাতিমান পরিচালক ক্রিস্টিয়ান মুঙ্গিউ। তার চলচ্চিত্র ‘ফিয়র্ড’ আধুনিক সমাজের ভেতরের ফাটল, ভণ্ডামি এবং সহনশীলতার প্রশ্নকে গভীর রাজনৈতিক রূপকে তুলে ধরেছে। পুরস্কার হাতে নিয়ে মুঙ্গিউ বলেন, ‘সিনেমা এখনো মানুষের গল্প বলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।’ তার বক্তব্যের পর দীর্ঘ করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো অডিটোরিয়াম।

এ বছরের প্রতিযোগিতা বিভাগে ২২টি চলচ্চিত্র অংশ নেয়। জুরি বোর্ডের সভাপতিত্বে ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতিমান পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক পার্ক চ্যান-উক। পাম দ’অরের পাশাপাশি গ্রাঁ প্রি, জুরি পুরস্কার, সেরা পরিচালক, সেরা চিত্রনাট্য, সেরা অভিনেতা ও সেরা অভিনেত্রী বিভাগেও বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।

অনুষ্ঠানের আবেগঘন মুহূর্তে কিংবদন্তি শিল্পী বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ডকে সম্মানসূচক পাম দ’অর প্রদান করা হয়। চলচ্চিত্র ও সংগীতে তার আজীবন অবদানের স্বীকৃতিতে এই সম্মাননা দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে তার কর্মজীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত নিয়ে একটি বিশেষ ভিডিও প্রদর্শন করা হলে উপস্থিত অনেক অতিথি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পাঠানো বার্তায় স্ট্রাইস্যান্ড বলেন, ‘সিনেমা মানুষকে একত্র করে। ভাষা ও সংস্কৃতির সীমা অতিক্রম করে এটি আমাদের অনুভূতিগুলোকে যুক্ত করে।’

বিচারকদের মতে, এবারের চলচ্চিত্রগুলোতে যুদ্ধ, অভিবাসন, পরিচয় সঙ্কট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার মতো সমসাময়িক বিষয় গভীরভাবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সমালোচকরা এবারের প্রতিযোগিতাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী লাইনআপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে জাপানি পরিচালক রিউসুকে হামাগুচির নতুন চলচ্চিত্র, রুশ নির্মাতা আন্দ্রেই জভিয়াগিনৎসেভের রাজনৈতিক রূপকধর্মী কাজ এবং পোলিশ পরিচালক পাভেল পাভলিকোভস্কির মানবিক গল্পভিত্তিক সিনেমার নাম। ইউরোপীয় আর্টহাউস সিনেমার পাশাপাশি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্রও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

উৎসব কর্তৃপক্ষ জানায়, বৈচিত্র্যময় গল্প, নতুন ভাষার চলচ্চিত্র এবং তরুণ নির্মাতাদের শক্তিশালী উপস্থিতি আন্তর্জাতিক সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে।

কানের সমাপনী সন্ধ্যা মানেই বিশ্ব ফ্যাশনের অন্যতম বড় মঞ্চ। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিভিন্ন দেশের তারকারা বৈচিত্র্যময় পোশাকে লালগালিচায় হেঁটে আলোকচিত্রী ও দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। ভারতের অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে আলোচিত। ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক নকশার সমন্বয়ে তৈরি পোশাকে ক্যামেরার সামনে হাজির হতেই মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার ছবি। হলিউড তারকা, ইউরোপীয় নির্মাতা ও এশিয়ার উদীয়মান অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতিও দর্শকদের দৃষ্টি কেড়েছে।

শুধু পুরস্কার ও প্রদর্শনী নয়, উৎসবকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাণিজ্যও ছিল বেশ সক্রিয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশকরা নতুন চলচ্চিত্রের বিপণন, আন্তর্জাতিক মুক্তি এবং যৌথ প্রযোজনার সম্ভাবনা নিয়ে বৈঠকে বসেন। আয়োজকদের তথ্যমতে, এবারের মার্শে দ্যু ফিল্মে শতাধিক দেশের অংশগ্রহণ ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝেও চলচ্চিত্র শিল্পে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও যৌথ প্রযোজনার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধোত্তর মানসিকতা, অভিবাসীদের জীবনসংগ্রাম এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে মানুষের একাকিত্বকে এবারের কান নতুনভাবে পর্দায় তুলে ধরেছে- যা বিশ্ব রাজনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার দর্পণ হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে। এখন কান-আলোচিত সিনেমাগুলো কবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাগৃহ ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে আসবে, সে অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন বিশ্বের কোটি চলচ্চিত্রপ্রেমী।