নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ধনী দেশগুলোতে বহু বছরের শ্রমঘাটতি, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর প্রবাহ এবং মানবিক সুরক্ষা নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অভিবাসন প্রবাহ হঠাৎ নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা- এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও- শ্রমবাজারে মন্দা, ভিসা নিয়মের কঠোরতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে কাজ-সম্পর্কিত অভিবাসন এক ঝটকায় ২০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। এই চিত্র উঠে এসেছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে।
কাজ-সম্পর্কিত অভিবাসন কেন কমছে?
ওইসিডির আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিভাগের প্রধান জিন-ক্রিস্টোফ ডুমন্ট জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি ‘অনুকূলতার বাইরে’ চলে যাওয়ায় শ্রমবাজারে নিয়োগ কমেছে। একই সাথে উচ্চ অভিবাসনের ওপর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং ভিসানীতির ব্যাপক পরিবর্তন পরিস্থিতি আরো কঠিন করেছে।
২০২৩-২৪ সালে ধনী দেশগুলোতে স্থায়ী কাজের উদ্দেশ্যে আগত মানুষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৪ হাজার, যা আগের বছরের তুলনায় ২১ শতাংশ কম। যুক্তরাজ্যে এই কমার হার আরো নাটকীয়- ৪০ শতাংশেরও বেশি।
ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে কমেছে আগমন
গবেষণা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আগমন হ্রাস শুরু হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ফেরার আগেই। ২০২৪ সালের শুরু থেকেই মার্কিন ভিসানীতি কঠোর হতে থাকে, এবং সেই প্রভাব কর্মভিত্তিক অভিবাসনে সরাসরি পড়ে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০.৫ শতাংশ কমিয়ে ২.৮ শতাংশ করেছে- ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতিকে এ জন্য দায়ী করেছে সংস্থাটি।
অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে পরিবর্তন : বড় ভরসা ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা
ইউরোপে শ্রমঘাটতি কমার পেছনে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা। রাশিয়ার আক্রমণের পর প্রায় ৫.১ মিলিয়ন ইউক্রেনীয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং তাদের বড় অংশই সরাসরি শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছে। এর ফলে অনেক দেশে বিদেশী শ্রমিকের প্রয়োজন কমেছে।
অন্য ধরনের অভিবাসন কী অবস্থায়?
শিক্ষার্থী অভিবাসন : গত দুই বছরে ওইসিডি দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর প্রবাহ ১৩ শতাংশ কমেছে। এর কারণ- অভিবাসন জালিয়াতির অভিযোগ, আবাসন খাতে সঙ্কট ও অতিরিক্ত জনঘনত্বের চাপ।
মানবিক অভিবাসন : বরং বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। যুক্তরাজ্যে ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আগমন আবারো তীব্র হয়েছে।
এর ফলে স্থায়ী অভিবাসন সামগ্রিকভাবে কিছুটা কমলেও অস্থায়ী শ্রমভিত্তিক ভিসা ২.৩ মিলিয়নে স্থির রয়েছে- যা মহামারী-পূর্ব স্তরের ওপরেই আছে।
অভিবাসন সংখ্যা: রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা
২০২৩ সালে ওইসিডি দেশগুলোতে রেকর্ড ৬.৫ মিলিয়ন লোক স্থায়ী বসতি নিয়েছে- এটি ২০২২ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। এই বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে যুক্তরাজ্যে।
কানাডা, জাপান, ফ্রান্স- সবখানেই অভিবাসন রেকর্ড সংখ্যায় পৌঁছেছিল। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে পেয়েছিল ১.২ মিলিয়ন স্থায়ী বৈধ অভিবাসী।
অভিবাসন কি অর্থনীতির ‘অভিশাপ’ নাকি ‘আশীর্বাদ’?
রাজনৈতিকভাবে অভিবাসন প্রশ্নটি উত্তপ্ত হলেও অর্থনৈতিক ফল কিন্তু ভিন্ন। গোল্ডম্যান শ্যাক্সের গবেষণায় বলা হয়- ২০২৩ সালে কানাডা, সুইডেন, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ডে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে অভিবাসীদের কারণে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন যোগ করেছে চার মিলিয়নের বেশি চাকরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অভিবাসন কমলে পরবর্তী দুই বছরে ধনী দেশের শ্রমবাজারে নতুন ঘাটতি ও মজুরি-চাপ তৈরি হবে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা : অভিবাসন কি আবার বাড়বে?
ডুমন্টের মূল্যায়ন- ২০২৫ সালে অভিবাসন কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে তা উচ্চ থাকবে। কারণ- ওইসিডি দেশগুলোতে বিদেশ-জন্ম কর্মীদের কর্মসংস্থানের হার স্থিতিশীল, দক্ষতাভিত্তিক ভিসা কর্মসূচির সম্প্রসারণ আর নি¤œদক্ষ শ্রমে স্থানীয়দের অনাগ্রহ।
যুক্তরাজ্যে বিদেশে জন্ম নেয়া কর্মীদের মধ্যে কর্মসংস্থানের হার দাঁড়িয়েছে ৭৬ শতাংশ, যা স্থানীয়দের তুলনায় সামান্য বেশি।
অভিবাসন রাজনীতির ভবিষ্যৎ : উত্তপ্ত, অনিশ্চিত, ঝুঁকিপূর্ণ
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিওলা মিয়েরেস আল জাজিরাকে বলেন- ‘কৃষি, নির্মাণ, স্বাস্থ্য, যেসব ক্ষেত্রে অভিবাসীরা বেশি কাজ করেন, সেখানে স্থানীয় শ্রমিক সঙ্কট স্পষ্ট। অভিবাসন আগামী কয়েক বছর ইউরোপ-আমেরিকার নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। এখানে আবেগ বেশি, যুক্তি কম।’
বৈশ্বিক চিত্র : কোন দিকে যাচ্ছে অভিবাসন নীতি?
বিশ্লেষকদের মতে- যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়বে, কানাডা উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন অভিবাসনে নজর দেবে, অস্ট্রেলিয়া কঠোর ভিসাসংস্কার বজায় রাখবে এবং ইউরোপে ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা শ্রমবাজারে বড় ভূমিকা রাখতে থাকবে।
অভিবাসন কেবল মানবিক বা অর্থনৈতিক নয়, এটি এখন সমগ্র রাজনীতি, শ্রমবাজার, ডেমোগ্রাফি ও ভূরাজনীতির কেন্দ্রীয় উপাদান।
কাজ-সম্পর্কিত অভিবাসন কমার মধ্য দিয়ে এর নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে- এ অধ্যায় আরো জটিল, আরো অনিশ্চিত এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত।



