ডিজিটাল অবকাঠামো প্রস্তুত তবুও বন্ধ অনলাইনে মিউচুয়াল ফান্ড লেনদেন

শাহ আলম নূর
Printed Edition

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রস্তুত, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন মিলেছে, এমনকি পরীক্ষামূলক লেনদেনও সম্পন্ন হয়েছে তবু অনলাইনে শুরু হয়নি ওপেন-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট কেনাবেচা। প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও বিধান থাকলেও স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয় ঘাটতিতে কার্যক্রম থমকে আছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা এখনো ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় ইউনিট লেনদেনে বাধ্য হচ্ছেন, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং পরীক্ষামূলক লেনদেন সম্পন্ন সবকিছুই প্রায় শেষ। তারপরও ওপেন-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট অনলাইনে লেনদেন শুরু হয়নি। প্রায় এক বছর আগে প্ল্যাটফর্ম প্রস্তুত করার দাবি করলেও এখনো কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে কেন এই বিলম্ব ।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সূত্র জানিয়েছে, তারা প্রায় এক বছর আগে ওপেন-এন্ডেড ফান্ডের জন্য একটি অনলাইন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম স্থাপন করেছে এবং পরীক্ষামূলক (মক) ট্রেডিংও সম্পন্ন করেছে। সিএসইর ভাষ্য অনুযায়ী, সব পক্ষের সম্মতি মিললে সাত দিনের মধ্যেই অনলাইনে লেনদেন শুরু করা সম্ভব।

বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ এবং ক্লোজড-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট অনলাইনে সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেন করা যায়। কিন্তু ওপেন-এন্ডেড ফান্ডের ক্ষেত্রে এখনো পুরো প্রক্রিয়াটি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। বিনিয়োগকারীদের ইউনিট কিনতে হলে সংশ্লিষ্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে আবেদন করতে হয় এবং সরাসরি তাদের হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করতে হয়। ইউনিট বরাদ্দ হলে তা বিনিয়োগকারীর বিও হিসাবে জমা হয়। বিক্রির ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এ জন্য বিনিয়োগকারীকে সংশ্লিষ্ট অ্যাসেট ম্যানেজারের কাছে আবেদন করতে হয় এবং ব্রোকারকে অবহিত করতে হয়, যাতে ইউনিট স্থানান্তর সম্পন্ন হয়।

সিএসইর চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, প্ল্যাটফর্মটি কিভাবে কাজ করে সে বিষয়ে তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ব্রিফিং দিয়েছেন, ডেমোনস্ট্রেশন করেছেন এবং মতামত নিয়ে ত্রুটি সংশোধনও করেছেন। তার মতে, বর্তমানে আইনগত কাঠামো বিদ্যমান থাকায় অ্যাসেট ম্যানেজারদের সাথে সমঝোতা হলেই অনলাইন লেনদেন শুরু করা যাবে।

তথ্যে দেখা যায়, সিএসইর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ৫০টির বেশি অ্যাসেট ম্যানেজারের সাথে বৈঠক এবং মক ট্রেডিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবু বাস্তবে অনলাইন লেনদেন শুরু হচ্ছে না।

ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে তারা অবগত আছেন, তবে এখনো সর্বশেষ আপডেট পাননি। কেন অ্যাসেট ম্যানেজাররা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন না সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

নভেম্বর মাসে সংশোধিত মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা প্রকাশের সময় ওপেন-এন্ডেড ফান্ডের অনলাইন লেনদেন সহজ করতে একটি পৃথক ধারা সংযোজন করা হয়। আগের বিধিমালায় এমন কোনো বিধান ছিল না। নতুন বিধান অনুযায়ী, ওপেন-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ডকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অথবা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃক অনুমোদিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লেনদেন করতে হবে। একই সাথে বিধিমালা জারির ছয় মাসের মধ্যে অনলাইন লেনদেন চালুর বাধ্যবাধকতাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, অনলাইন লেনদেন শুরু করতে প্রয়োজনীয় বিধান তারা স্পষ্টভাবে প্রণয়ন করেছেন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন। প্রয়োজনে যেকোনো পক্ষকে সহায়তা দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রস্তুত আছে। তিনি বলেন, আমরা আমাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে প্রস্তুত। প্রয়োজনে আরো সহায়তা দেয়া হবে।

এদিকে সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম সাইফুর রহমান মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলছেন, সংশোধিত বিধিমালার ভাষ্য এমনও হতে পারে যে অ্যাসেট ম্যানেজাররাই নিজেরা আলাদা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারেন। তার দাবি, অনেক অ্যাসেট ম্যানেজার অনলাইন ট্রেডিংয়ে আগ্রহী নন।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওপেন-এন্ডেড ফান্ডের প্রকৃতি ক্লোজড-এন্ডেড ফান্ডের চেয়ে আলাদা। ক্লোজড-এন্ডেড ফান্ডের ইউনিট নির্দিষ্ট সংখ্যায় ইস্যু হয় এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে সরাসরি লেনদেন হয়। কিন্তু ওপেন-এন্ডেড ফান্ডে ইউনিট সংখ্যা চাহিদা অনুযায়ী বাড়ে-কমে এবং সাধারণত নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয় হয়। ফলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এনএভি আপডেট, অর্ডার ম্যাচিং এবং সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়া কিভাবে হবে সে বিষয়ে প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জরুরি।

বর্তমানে দেশে ওপেন-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ডের সংখ্যা ৯০টির বেশি। এই ফান্ডগুলোতে লক্ষাধিক বিনিয়োগকারী যুক্ত আছেন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন লেনদেন চালু হলে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি স্টক এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইউনিট কেনাবেচা করতে পারবেন, যা স্বচ্ছতা ও গতি বাড়াবে। পাশাপাশি লেনদেন ব্যয় ও সময় কমবে।

অন্যদিকে অ্যাসেট ম্যানেজারদের একটি অংশের আশঙ্কা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু হলে তাদের বিদ্যমান বিক্রয় ও রিডেম্পশন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ বাড়তে পারে। কেউ কেউ মনে করছেন, ইউনিট ইস্যু ও রিডেম্পশনের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে ব্যবসায়িক কৌশলেও প্রভাব পড়তে পারে।

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত সমন্বয়ের অভাবই বিলম্বের প্রধান কারণ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিধান দিয়েছে, স্টক এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, কিন্তু অ্যাসেট ম্যানেজারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এটি কার্যকর হবে না। একই সাথে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটালাইজেশনের এই যুগে পুঁজিবাজারের অবকাঠামো আধুনিকায়ন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ওপেন-এন্ডেড ফান্ডে অনলাইন লেনদেন চালু হলে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে আস্থা বাড়বে এবং অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সহজে ইউনিট কেনাবেচা করতে পারলে বাজারে তারল্য বাড়তে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তি প্রস্তুত, আইনগত ভিত্তি রয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে; তবু অনলাইন লেনদেন শুরু হয়নি। এখন নজর সিএসই ও অ্যাসেট ম্যানেজারদের মধ্যে সমঝোতার দিকে। সমন্বয় হলে দ্রুত কার্যক্রম শুরু সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন। অন্যথায় প্রস্তুত প্ল্যাটফর্ম হয়তো আরো কিছুদিন অফলাইনই থেকে যাবে।