রমজানের বাজারে সিন্ডিকেট

ডালের দামে স্বস্তি চিনি ও তেলে অস্বস্তি- ভোগ্যপণ্যের বাজার কি আবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে?

রমজানের এখনো এক মাসের বেশি সময় বাকি থাকলেও বাজারে অস্থিরতার আভাস স্পষ্ট। ডালজাতীয় পণ্যে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও চিনি ও ভোজ্যতেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এটি সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

রমজান এলেই বাংলাদেশের বাজারে এক ধরনের অদৃশ্য উত্তেজনা তৈরি হয়। নিত্যপণ্যের তাকগুলো যেন শুধু পণ্য নয়, মানুষের আশঙ্কা, প্রত্যাশা আর ক্ষোভও বহন করে। প্রতি বছর রমজানের আগে চিনি, ছোলা, ডাল, খেজুর ও ভোজ্যতেলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। ইফতার ও সেহরির খাদ্য তালিকায় এসব পণ্য অপরিহার্য হওয়ায় বাজারে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ চাহিদা সৃষ্টি হয়। এই বাড়তি চাহিদা অনেক সময়ই সুযোগ করে দেয় মুনাফালোভী গোষ্ঠী ও সিন্ডিকেটের জন্য, যারা সরবরাহ আটকে রেখে বা কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দেয়।

এ বছর রমজানের এখনো এক মাসের বেশি সময় বাকি থাকলেও বাজারে অস্থিরতার আভাস স্পষ্ট। ডালজাতীয় পণ্যে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও চিনি ও ভোজ্যতেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এটি সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করছে।

রমজানের খাদ্যাভ্যাস ও বাজারচাপের বাস্তবতা

রমজান মাসে দেশের খাদ্যাভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ইফতারে ছোলা, মটর ডাল, বেগুনি, পেঁয়াজু, চপ, চটপটি এসব খাবারের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই ছোলা ও ডাল ইফতারের মূল উপকরণ। রাতের খাবারে ডালের ব্যবহারও বাড়ে। খেজুর ছাড়া ইফতার কল্পনাই করা যায় না। শীতের শেষে পাম অয়েল ঘোলাটে হয়ে যাওয়ায় ভোক্তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সয়াবিন তেলের দিকে ঝোঁকে। ফলে রমজান ঘিরে নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্যের ওপর চাপ তৈরি হয়।

এই চাপ যদি স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সামলানো যায়, তাহলে বাজার স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সীমিতসংখ্যক বড় আমদানিকারক ও মিলার বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করায় সামান্য সরবরাহ ঘাটতিও দামে বড় প্রভাব ফেলে।

ডালে স্বস্তির বার্তা

চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জসহ দেশের বড় পাইকারি বাজারগুলোতে এবার ছোলা, মটর ডাল ও অস্ট্রেলিয়ান মসুর ডালের দাম গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের বছর বেশি আমদানির কারণে এখনো পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং চলতি মৌসুমেও আমদানি স্বাভাবিক।

বর্তমানে খাতুনগঞ্জে : মটর ডাল : কেজি ৪৪.৫০- ৪৫ টাকা (গত রমজানে ৬৫-৭০ টাকা); অস্ট্রেলিয়ান ছোলা : কেজি ৭৪-৭৫ টাকা (গত বছর ১০৫-১১০ টাকা); মোটা মসুর ডাল : কেজি ৭৩-৭৫ টাকা (গত বছর প্রায় ৯৫ টাকা); খুচরা বাজারেও মাঝারি দানার মসুর ডাল ১১০-১৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে ব্যতিক্রমও আছে। ভারতীয় চিকন মসুর ডালের দাম কেজিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫৫ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ছোট দানার মসুর ও মুগ ডালেও দাম বেড়েছে।

খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: মহিউদ্দিন বলেন, পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো কঠিন। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকাই মূল চাবিকাঠি।

চিনি : কৃত্রিম সঙ্কটের অভিযোগ

ডালের স্বস্তির বিপরীতে চিনি বাজারে অস্বস্তি বাড়ছে। নভেম্বর মাসে প্রতি মণ চিনির দাম ছিল প্রায় তিন হাজার ২১০ টাকা। জানুয়ারির শুরুতেই তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন হাজার ৪৭০ টাকায়। এক সপ্তাহেই ১৫০-১৭০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

খুচরা বাজারে খোলা চিনি এখন বিক্রি হচ্ছে কেজি ১০৫-১১৫ টাকায়, যেখানে এক মাস আগেও ছিল ৯৫-১০০ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বড়ভাবে না বাড়লেও দেশের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতি প্রশ্ন তুলছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েকটি বড় মিল থেকে নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। মিলাররা এলসি জটিলতা ও কাঁচামালের সঙ্কটের কথা বলছেন। তবে ভোক্তা সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এটি আসলে কৃত্রিম সঙ্কট।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই আগের বছরের তুলনায় প্রায় চার লাখ টন বেশি চিনি আমদানি হয়েছে। তবু বাজারে সঙ্কট তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক। ক্যাবের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সীমিতসংখ্যক শিল্পগোষ্ঠীর হাতে আমদানি ও সরবরাহ কেন্দ্রীভূত থাকায় সিন্ডিকেট তৈরি হচ্ছে।

ভোজ্যতেল : ধীরে ধীরে বাড়ছে চাপ

সয়াবিন তেলের দামও ধীরে ধীরে বাড়ছে। ডিসেম্বর মাসে প্রতি মণ সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রায় ছয় হাজার ৮০০ টাকা। এক মাসে তা বেড়ে ৬,৮৭০-৬,৯১০ টাকায় পৌঁছেছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মধ্যে সামান্য পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিক প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী। রমজান ঘনিয়ে এলে এই দাম আরো বাড়তে পারে-এমন আশঙ্কা বাজার বিশ্লেষকদের।

বাজারে কেন্দ্রীভূত শক্তি ও সিন্ডিকেট বাস্তবতা

বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২০-২২ লাখ টন চিনির চাহিদা থাকলেও রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো সরবরাহ করে মাত্র ৩০ হাজার টনের মতো। বাকি প্রায় পুরোটা আমদানিনির্ভর। এই আমদানির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে কয়েকটি বড় গ্রুপ। ফলে বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। সরবরাহ সামান্য কমালেই দাম বাড়ে।

এই কাঠামোই সিন্ডিকেট তৈরির সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

আইনি বিশ্লেষণ : বাজার কার হাতে, আইন কী বলে?

১. প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ : এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং কার্টেল বা সিন্ডিকেট প্রতিরোধ করা। কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী যদি দাম নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ সীমিত করা বা বাজার ভাগাভাগি করে, তা আইনত দণ্ডনীয়।

প্রতিযোগিতা কমিশন জরিমানা আরোপ, তদন্ত ও নির্দেশনা দিতে পারে। বাস্তবে দেখা যায়, কমিশনের সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে বড় গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা খুব কমই নেয়া হয়।

২. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ : এই আইন অনুযায়ী- অতিরিক্ত দাম রাখা, মজুদদারি, ভেজাল বা প্রতারণা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করতে পারে। তবে বড় সিন্ডিকেটের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা প্রায়ই প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে।

৩. দণ্ডবিধি ও বিশেষ আইন : কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি বা জনস্বার্থবিরোধী মজুদদারিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনের অভাব নয়, সমস্যা হলো প্রয়োগের ঘাটতি ও রাজনৈতিক প্রভাব।

মানবাধিকার বিশ্লেষণ : খাদ্যের অধিকার কি লঙ্ঘিত হচ্ছে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকের খাদ্য ও মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব উল্লেখ আছে। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের জীবনাধিকারের ব্যাখ্যায় সুপ্রিম কোর্ট বহুবার বলেছেন- জীবন মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন, যার অন্যতম উপাদান খাদ্য।

আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সনদের সদস্য। এর ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে পর্যাপ্ত খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রের ওপর রয়েছে।

যখন সিন্ডিকেটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন তা কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়-এটি একটি মানবাধিকার সঙ্কটে পরিণত হয়।

বিশেষ করে নি¤œ আয়ের মানুষ পুষ্টিহীনতায় পড়ে, শিশু ও বৃদ্ধদের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে, সামাজিক বৈষম্য আরো গভীর হয়। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বাজার মনিটরিং নয়, বরং মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সরকারি উদ্যোগ ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ

টিসিবি ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি বাড়াচ্ছে। বন্দর ও কাস্টমসকে দ্রুত খালাসের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ঘোষণাও আছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু ঘোষণা যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে কার্যকর সমাধানের জন্য দরকার- বড় আমদানিকারকদের উপর কঠোর নজরদারি, প্রতিযোগিতা কমিশনের স্বাধীন ও সক্রিয় ভূমিকা, মজুদ ও সরবরাহের রিয়েল-টাইম ডেটা প্রকাশ, ভোক্তা সংগঠনের অংশগ্রহণ।

বাজার নিয়ন্ত্রণ না মানবিক দায়?

রমজান শুধু ধর্মীয় মাস নয়-এটি সামাজিক সংহতি, সংযম ও ন্যায্যতার সময়। এই সময়ে যদি বাজার সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে, তবে তা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্বের ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে।

ডালে সাময়িক স্বস্তি থাকলেও চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা বড় সতর্ক সঙ্কেত। সরকার কতটা কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারে এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করবে, এ রমজানে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে ইফতার করতে পারবে কি না।