কে এম ছালেহ আহমদ জাহেরী
হিজরি তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীর সংযোগস্থলে যে ক’জন ক্ষণজন্মা মনীষী ইলমে হাদিস ও ইলমে ফিকহের সমন্বয়ে ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাদের অন্যতম ইমাম আবু জাফর ত্বহাবী র:; যিনি ছিলেন একাধারে একজন মুহাদ্দিস ও ফকিহ। ইলমে হাদিসের জটিল সমস্যা নিরসনে তার অবদান অবিস্মরণীয়।
নাম ও বংশ পরিচয় : নাম আহমদ, উপনাম আবু জাফর। পিতার নাম মুহাম্মদ। বংশপরম্পরা হলো- আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে সালামা ইবনে আব্দুল মালিক আল-আযদী আত-ত্বহাবী।
প্রাচীন মিসরের ‘ত্বহা’ নামক গ্রামে, ২৩৯ হিজরি সালে এ মহান মনীষী, জ্ঞানপিপাসু ও এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
বাল্যকালে তিনি তার মামা ইমাম মুযানী র:-এর কাছে লালিত-পালিত হন এবং তার কাছেই শাফেয়ি ফিকহ অধ্যয়ন করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি মিসর, সিরিয়া, বায়তুল মুকাদ্দাস ও অন্যান্য অঞ্চল সফর করে হানাফি ফিকহ এবং হাদিসশাস্ত্রের গভীর জ্ঞানার্জন করেন এবং হানাফি ফিকহের প্রতি আকৃষ্ট হন। গ্রহণ করেন হানাফি মাজহাব। জানা যায়, এ জন্য তার মামা একদিন ইমাম মুযানী বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! তোমার থেকে কিছুই হবে না।’ পরবর্তীতে ইমাম ত্বহাবী যখন বড় ইমাম হলেন, তখন বলেছিলেন, আল্লাহ আমার মামার প্রতি রহম করুন, তিনি জীবিত থাকলে তার কসমের কাফফারা দিতেন।
এ মহান মনীষী তার জীবদ্দশায় বহু কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। যা হাদিস ও ফিকহের এক অপূর্ব সমন্বয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- শরহু মাআনিল আসার। এটি কামিল শ্রেণীর পাঠ্যভুক্ত একটি কিতাব। রচনা করেছেন শরহু মুশকিলুল আসারসহ আরো অসংখ্য কিতাব।
অবশেষে, যুগশ্রেষ্ঠ এই ফিকহশাস্ত্রবিদ, আলোড়ন সৃষ্টিকারী জ্ঞানসাধক আল্লামা আবু জাফর ত্বহাবী র: বিশ্ববাসীকে শোক সাগরে ভাসিয়ে ৩২১ হিজরিতে ৯২ বছর বয়সে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যান। তাকে মিসরের কায়রোতে অবস্থিত, কায়রোর বিখ্যাত আল-কারাফা কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
শরহু মা’আনিল আসার’-এর পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য : সুনান গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘শরহু মা’আনিল আসার’ হাদিস ও ফিকহের এক অপূর্ব সংযোজন। সাধারণত সিহাহ সিত্তাহ বা অন্যান্য সুনান গ্রন্থে হাদিস সঙ্কলনের দিকে জোর দেয়া হয়। কিন্তু ইমাম ত্বহাবী র: তার কিতাবে হাদিস উল্লেখ করার পাশাপাশি উদ্ভাবন করেছেন, ফিকহি মাসয়ালা। নিরসন করেছেন হাদিসের বাহ্যিক বিরোধ। পাশাপাশি হানাফি ফিকহের দলিলগুলো অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করেছেন। ফলে সুনান গ্রন্থগুলোর মধ্যে এটি স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ একটি অবস্থান তৈরি করেছে।
পরবর্তী মুহাদ্দিস ও ফকিহরা এই কিতাবের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, হাদিসের চয়ন-বিন্যাস ও রচনাশৈলীর দিক থেকে এটি ‘সুনানে আবু দাউদ’ ও ‘সুনানে নাসায়ি’-এর সমকক্ষ। ফিকহুল হাদিসের ক্ষেত্রে এর কোনো তুলনা হয় না; বরং মাসয়ালা প্রমাণের ক্ষেত্রে, হানাফি ইমামদের কাছে এটি বুখারি ও মুসলিমের চেয়েও বেশি গুরুত্ব বহন করে।
এই মহান মনীষী কিতাবটি রচনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের আশ্রয় নিয়েছেন। যেখানে তিনি প্রথমে প্রতিপক্ষের দলিল, এরপর নিজের পক্ষের দলিল এবং শেষে ‘নজর’ বা যুক্তির মাধ্যমে সামঞ্জস্য বিধান করেন এবং অন্যান্য সুনান গ্রন্থের তুলনায় এই কিতাবেও ‘নাসিখ’ (রহিতকারী) ও ‘মানসুখ’ (রহিত) হাদিসগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিন্যস্ত করেছেন।
তুলে এনেছেন রিজাল শাস্ত্রের আলোচনাও। প্রতিটি হাদিসের সনদ ও রাবিদের (বর্ণনাকারীদের) সমালোচনা ও পর্যালোচনা করেছেন, যা একে উচ্চমানের ইলমি কিতাবের মর্যাদা দিয়েছে। যেখানে তিনি মারফু, মাওকুফ এবং আসারের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ২২ হাজার ২৪০টি হাদিস সঙ্কলন করেছেন।
তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আর অতুলনীয় পাণ্ডিত্যের বহিঃপ্রকাশ এই গ্রন্থ। যা যুগে যুগে জ্ঞানপিপাসুদের জ্ঞানপিপাসা নিবারণ করে আসছে এবং হানাফি মাজহাবকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
লেখক : শিক্ষার্থী, দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদরাসা, ডেমরা, ঢাকা।



