মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে না : আইনমন্ত্রী

আলমগীর কবির
Printed Edition
মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে না : আইনমন্ত্রী
মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে না : আইনমন্ত্রী

নতুন আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা কোনোভাবেই খর্ব করা হচ্ছে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। গতকাল সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বিয়ন্ড দ্য ব্যালট : বিটুইন প্রমিস অ্যান্ড পারফরম্যান্স-নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ : রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা জানান। একই সাথে অনুষ্ঠান শেষে বের হয়ে যাওয়ার সময় দৈনিক নয়া দিগন্তের এক সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য পুনর্ব্যক্ত করেন। সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত উক্ত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও আইন পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন আইনি সংস্কার ও নীতির কড়া সমালোচনা করেন ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি)-এর প্রতিনিধি মনিরা শারমিন। তিনি বলেন, বিগত সরকারের ১৫ বছরের রাজনৈতিক ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে মুক্ত পরিবেশে কথা বলতে পারা একটি পজিটিভ (ইতিবাচক) দিক হলেও বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান রয়ে গেছে। বিএনপির ৩১ দফার ৯ম, ১০ম ও ১৩তম দফায় যথাক্রমে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ রোধ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠনের কথা বলা সত্ত্বেও বাস্তবে ২০১৩ সালের শেখ হাসিনা সরকারের আমলের আইন দিয়েই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলার জন্য আগাম অনুমোদনের শর্ত বিদ্যমান।

গুম ও মানবাধিকার সংক্রান্ত খসড়া অধ্যাদেশের তীব্র সমালোচনা করে মনিরা শারমিন বলেন, সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়েই করানোর বিধান রাখা হয়েছে, যা মূলত ‘নিজের বিচার নিজে করার’ সুযোগ তৈরি করে। গত ১০ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়া মোস্তাক মিরাজ শেখের পরিবার কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও তা গ্রহণ করার মতো কেউ নেই। উপরন্তু, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে ভুক্তভোগী পরিবারকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়ার মতো ঝুঁঁকির জায়গা রাখা হয়েছে। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে অতীতে গুমের শিকার হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেআইনি রাজনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে বিপদে ফেলা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

একই আলোচনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক দিদারুল আলম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশে র‌্যাব এবং ডিজিএফআই-এর কথা বললেই সাধারণ মানুষের মনে গুম ও খুনের প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ভেসে ওঠে। অন্তর্বর্তীকালীন সময় থেকেই জনগণের দাবি ছিল এ প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল পরিবর্তন ও সংস্কার করা, যাতে আগের অপকর্মের দায় নতুন সংগঠনের ওপর না পড়ে। কিন্তু সরকার পূর্ববর্তী অপরাধগুলোর সুষ্ঠু বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে একই পুরনো ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখছে এবং প্রমোট করছে। বর্তমান সরকার যদি বিএনপি বা ক্ষমতার ধারাবাহিকতায় ‘ফ্যাসিজম ২.০’ বা মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করতে চায়, তবে জনগণকে বাধ্য হয়ে পুনরায় ‘অভ্যুত্থান ২.০’-এর পথ বেছে নিতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।

সংলাপে অংশগ্রহণকারীদের সমালোচনামূলক বক্তব্য ও তোপের মুখে পড়ার পর প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। তিনি শুরুতেই বলেন, সকালে এসে এমন তোপের মুখে পড়ার আশা না করলেও উত্থাপিত প্রশ্নগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক। নাগরিকদের এ সমালোচনাকে সরকার পজিটিভভাবে গ্রহণ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি আমাদের এভাবে তোপের মুখে না রাখেন, তবে আমরা পথ হারাতে পারি বা অনেক সংস্কারের কথা ভুলে বিভ্রান্ত হতে পারি।’ তবে সমালোচনার ধার, ভাষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি বা তার পরিবার কখনোই দুর্নীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না এবং আইনজীবী হিসেবে সচ্ছলভাবে জীবনযাপনের মতো পর্যাপ্ত আয় তার রয়েছে। রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়ে মন্ত্রী পরিষ্কার করেন যে, কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না হলে তাদের সভা-সমাবেশ করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং সরকারের সমালোচনা করা নাগরিকদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

আইন ও নীতিমালার ক্ষেত্রে সরকার কোনো বিষয়কে অপরিবর্তনীয় মনে করে না উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী জানান, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে নজিরবিহীনভাবে তিন-চার ধাপে পাবলিক কনসালটেশন (জনমত যাচাই) করা হয়েছে। গুমের ঘটনাকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে যেগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গণহারে বা ‘ওয়াইড¯েপ্রড অ্যান্ড সিস্টেমেটিক’ (ব্যাপক ও পদ্ধতিগত) উপায়ে করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচার হবে; আর সাধারণ ব্যক্তিগত কোন্দল বা স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপব্যবহার করে তুলে নেয়ার ঘটনাগুলো অর্ডিনারি ক্রিমিনাল কোর্টে (সাধারণ আদালতে) বিচার হবে। পাশাপাশি, মিথ্যা মামলা ও ঢালাও চার্জশিট রোধে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং বর্তমানে পুলিশের মাধ্যমে রাজনৈতিক মামলার হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

সংবিধান ও বিচার বিভাগীয় সংস্কার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানকে ভিত্তি ধরে এবং ‘জুলাই সনদ’-এর অঙ্গীকার অনুযায়ী সরকার এগোচ্ছে। কেশবানন্দ ভারতী মামলা ও অষ্টম সংশোধনীর রায়ে স্বীকৃত ‘বেসিক স্ট্রাকচার থিওরি’ (সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্ব) মাথায় রেখেই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। ১৭ সদস্যের সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিএনপির জন্য পাঁচটিসহ বিরোধী দলগুলোর জন্য রাখা আসনগুলো পূরণ হলেই পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া শুরু হবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ সরাসরি বাতিল করা হয়নি, বরং নিম্ন আদালতের বিচারকদের প্রশাসনিক চাপ বা সাফোকেশন সংক্রান্ত উদ্বেগ বিবেচনা করে তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। শোকজ করা বিচারকদের প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, তাদের বিচারিক কাজের জন্য নয়; বরং ফার্মগেটে কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনে যুক্ত হওয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনাকাক্সিক্ষত মন্তব্য করে জুুডিশিয়াল কোড অব কন্ডাক্ট (আচরণবিধি) লঙ্ঘনের কারণে শোকজ করা হয়েছিল এবং ভুল বুঝতে পারায় তা ড্রপ করা হয়।

সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফের জামিন প্রসঙ্গে তিনি পরিষ্কার করেন যে, জামিনযোগ্য ধারায় এটি একটি স্বাধীন জুডিশিয়াল অর্ডার (বিচারিক আদেশ) ছিল এবং এতে সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না। জামিনের সিদ্ধান্তে কোনো আপত্তি থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আপিল বা রিভিশনের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া গণভোট এবং জুলাই সনদের ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ (উচ্চকক্ষ) নিয়ে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) এবং নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়টি আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাধান করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

অনুষ্ঠান শেষে বের হয়ে যাওয়ার সময় দৈনিক নয়া দিগন্তের এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান পুনরায় নিশ্চিত করেন যে, নতুন আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা কোনোভাবেই খর্ব করা হচ্ছে না। যেকোনো প্রতিষ্ঠানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রথমে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে এবং সুপিরিয়র কমান্ডের (উচ্চপদস্থ) কোনো কর্মকর্তা ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিলে তিনি আর সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির দোহাই দিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে পারবেন না। জবাবদিহির এ ব্যবস্থা প্রয়োগের পর প্রয়োজনে আরো সংশোধন এনে মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা হবে।

উক্ত অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, গণফোরাম সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান।