বিশেষ সংবাদদাতা
জ্বালানি সঙ্কটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের ফলে জনরোষ বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের একটি অংশ বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর করতে পারে। গতকাল অ্যাসোসিয়েশনের দফতর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিটি আইজিপির কাছে পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছে, জ্বালানি সঙ্কট ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ ঘাটতি বেড়েছে। কোথাও কোথাও দিনে ৮, ১০ এমনকি ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
এ দিকে চলমান বিদ্যুৎ সঙ্কটের অন্যতম কারণ হিসেবে গ্যাসের ঘাটতিকে চিহ্নিত করেছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে জাতীয় পর্যায়েও লোডশেডিং তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে নতুন কৌশলে কাজ শুরু করেছে সরকার। এর ফলে আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যার দিকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এতে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহক, অর্থাৎ প্রায় চার কোটি মানুষ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ পান। জাতীয়ভাবে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও তাদের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। তবে সমিতিগুলো নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যায়, সেটিই গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
জানা গেছে, গত কয়েক দিনে ৮০টি সমিতির সম্মিলিত গড় বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। বিপরীতে তারা পেয়েছে গড়ে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এ ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ জনপদের বিদ্যুৎ সরবরাহে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ও নিরাপত্তা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন। চিঠির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও রয়েছে একাধিক সঙ্কট। বঙ্গোপসাগরের বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান টার্মিনালে নতুন এলএনজি খালাসে সমস্যা হচ্ছে। অন্য দিকে দুর্ঘটনার পর এক্সেলারেট এনার্জির টার্মিনালও এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা যায়নি। ফলে আমদানি করা এলএনজির সরবরাহেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে মালয়েশিয়ার কাছ থেকে অন্তত একটি এলএনজি কার্গো আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আনার বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার। তবে এ ধরনের বিশেষ ট্যাংক দ্রুত সংগ্রহ করা কঠিন হওয়ায় এটিকে মধ্যমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারের হাতে থাকা সব বিকল্প নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও পরামর্শ নেয়া হচ্ছে। তবে বর্তমান সঙ্কটের জন্য আগের সরকারের জ্বালানি নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যথেষ্ট গুরুত্ব না দেয়ার কারণেই সঙ্কটের ভিত্তি আগে তৈরি হয়েছে। ভুল নীতি গ্রহণ করলে একসময় তার ‘মাশুল দিতে হয়’।
এদিকে পল্লী বিদ্যুৎ স্থাপনায় নিরাপত্তা চেয়ে দেয়া চিঠির বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয় এ চিঠি দেয়নি। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ঘাটতির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর। দীর্ঘ লোডশেডিং অব্যাহত থাকলে জনঅসন্তোষ আরো বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।


