জীবনসায়াহ্নে এসে একটু প্রশান্তি আর স্বজনদের সান্নিধ্য পাওয়ার পরিবর্তে নিঃসঙ্গতা, অবহেলা আর যন্ত্রণাদায়ক হাহাকারই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণদের। বুকভরা ভালোবাসা দিয়ে তিল তিল করে যাদের বড় করেছেন, সেই সন্তানদের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে অনেক মা-বাবার শেষ ঠিকানা এখন প্রবীণ নিবাসের চার দেয়াল। সেখানে দিন কাটে, বছর ঘোরে, কিন্তু সন্তানদের দেখা মেলে না। এক বুক হাহাকার আর চাপা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তারা অপেক্ষায় থাকেন প্রিয় মুখের, অথচ সেই প্রতীক্ষার প্রহর যেন আর শেষ হয় না।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যান্ত্রিক সভ্যতার দ্রুত পরিবর্তন এবং পারিবারিক কাঠামোর রূপান্তর প্রবীণদের এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। আগে একান্নবর্তী পরিবারে প্রবীণদের যে সম্মান ও গুরুত্ব ছিল, আধুনিক একক পরিবার ব্যবস্থায় তা বিলুপ্তপ্রায়। নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং ক্রমবর্ধমান আত্মকেন্দ্রিকতার ফলে মানুষের ভেতর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মনুষ্যত্ববোধ। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া এড়াতে কিংবা তথাকথিত ‘স্ট্যাটাস’ রক্ষা করতে বৃদ্ধ মা-বাবার ঠাঁই হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে।
৭০ বছর বয়সী জুলেখা (ছদ্মনাম) জীবনের প্রতিটি পরতে লড়াই করেছেন। অভাবের সংসারে রক্ত পানি করা পরিশ্রমে তিন সন্তানকে শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। স্বপ্ন ছিল শেষ বয়সে নাতি-নাতনিদের সাথে সময় কাটাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন তছনছ হয়ে গেছে। ছেলেরা এখন বিত্তবান ও প্রতিপত্তিশালী হলেও তাদের সংসারে মায়ের জায়গা হয়নি। পুত্রবধূদের ‘আভিজাত্যের’ সাথে মানানসই নয় বলে জুলেখাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘সন্তান-নাতি সবই আছে, তবুও আজ আমি বড় একা। এই নিবাসই এখন আমার চিরসাথী।’
জুলেখার পাশে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন আরেক বৃদ্ধা। অভাবের দিনে সন্তানের স্কুলের খরচ জোগাতে নিজের বিয়ের গয়না পর্যন্ত বিক্রি করেছিলেন তিনি। আজ সেই সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত ও ব্যস্ত, কিন্তু মায়ের শেষ বয়সের ভরসা হওয়ার সময় তাদের নেই। ভাঙা গলায় তিনি বলেন, ‘সন্তান ভালো আছে- এই ভেবেই শান্ত থাকি। শুধু মনে হয়, এত পথ পাড়ি দিয়ে শেষ ঠিকানাটা যদি এখানে না হতো!’
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৬০ বছর ঊর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৫৩ লাখ। এদের একটি বড় অংশ পারিবারিক অবহেলা বা সামাজিক কারণে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। দেশে চাহিদার চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। বর্তমানে সরকারিভাবে সমাজসেবা অধিদফতরের অধীনে মাত্র ছয়টি ‘শান্তিনিবাস’ পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু প্রবীণ নিবাস গড়ে উঠলেও সেগুলোর সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
আগারগাঁও প্রবীণ নিবাসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে জানান, এখানে শুধু দরিদ্র পরিবারের মানুষই নন, বরং অনেক ধনাঢ্য ও উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাবেক শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক ও অধ্যাপক রয়েছেন, যাদের সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা কানাডায় উচ্চপদস্থ চাকরিতে নিয়োজিত। পারিবারিক কলহ আর নিঃসঙ্গতা তাদের এখানে নিয়ে এসেছে। তিনি আরো বলেন, ‘বৃদ্ধাশ্রম এলে প্রবীণদের হাহাকার আর বিষাদের জাদুঘর। এখানে এমনও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যে, বাবা মারা যাওয়ার পর সন্তানকে খবর দিলেও তারা লাশ নিতে আসে না।’
বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের কাছে ঈদ মানেই সবচেয়ে বড় কষ্টের দিন। চার দিকে যখন খুশির আমেজ, তখন তারা অপেক্ষায় থাকেন একটি ফোন কল কিংবা ক্ষণিকের জন্য স্বজনদের দেখার। কিন্তু অধিকাংশেরই সেই অপেক্ষা বিফলে যায়। প্রবীণ নিবাসের কর্মকর্তারা তাদের নতুন কাপড় ও উন্নত খাবার দিয়ে খুশি করার চেষ্টা করলেও স্বজনদের অভাব পূরণ হয় না। অনেকে মানসিক যন্ত্রণায় থাকলেও বাড়িতে ফিরতে চান না। তাদের মতে, বাড়িতে গিয়ে সন্তানদের অবহেলা আর অপমান সহ্য করার চেয়ে এই নিবাসে অপরিচিতদের সাথে থাকাই বেশি সম্মানের।
বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিটি দেয়াল যেন একেকটি ত্যাগের বিসর্জনের সাক্ষী। প্রবীণদের মতে, যদি প্রতিটি সন্তান তাদের মা-বাবার ছোটবেলার ত্যাগের কথা একটু চিন্তা করত, তবে পৃথিবীর কোনো বৃদ্ধাশ্রমেই এমন হাহাকার ধ্বনিত হতো না। প্রবীণদের এই অমানবিক নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ।



