ভোটের হারে রেকর্ড গড়তে পারে এবারের নির্বাচন

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

বিগত প্রায় দেড় দশকে মানুষ স্বচ্ছন্দে ভোট দিতে পারেনি। সেজন্য এবার নির্বাচনে ভোট দিতে উৎসুক হয়ে আছে মানুষ। শহর থেকে গ্রামে সর্বত্রই এখন নির্বাচনের আমেজ। গ্রামে ভোট দিতে গত কয়েক দিনে কয়েক লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার বাস, ট্রেন, লঞ্চে ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। বিভিন্ন জরিপেও প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ এবার ভোট দিতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভোট না দিতে যাওয়ার আহ্বানের কারণে এ হার কিছুটা কমতে পারে। আর নির্বাচন কমিশন আশা করছে এবার ভোটের হার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭, নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং হিজড়া ভোটার এক হাজার ২৩৪ জন। জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা তরুণ। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটার রয়েছেন চার কোটি ৩৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪২১ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ শতাংশ।

আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ভোট শুরু হয়ে চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পর ভোট দিতে মানুষ রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর থেকে গ্রামে ছুটেছেন। ফলে গ্রাম থেকে শহর সর্বত্রই চলছে এখন উৎসবের আমেজ। শহর এবং গ্রামের মানুষ ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন। বড় ধরনের কোনো গোলযোগ না হলে বেশির ভাগ ভোটারই ভোটকেন্দ্রে যাবেন। তবে আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকরা নো বোট নো ভোট পলিসি নেয়ায় ভোট কিছুটা কমতে পারে। তবে এরপরও আওয়ামী লীগের একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবেন। এ ভোট বিএনপি ও জামায়াতে ভাগ হয়ে যাবে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এক জরিপের মাধ্যমে জানিয়েছে, এবার ৯০ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ‘গুড গভর্ন্যান্স ফোরাম’ (জিজিএফ) জরিপে জানিয়েছে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ ভোট দিতে চান। আর ইনসাইট ইন্টারন্যাশনালের জরিপ বলছে এবার ভোটার উপস্থিতির হার হতে পারে ৬৭ দশমিক ৭০ শতাংশ।

তবে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হতে পারে বলে আশা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে ভোট দেয়ার যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তাতে ভোটের হার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটার প্রায় সাড়ে চার কোটি। যারা এই প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। এই ভোটাররাই এবার জয়-পরাজয়ে নির্ধারণ করে দিতে পারেন। এ ছাড়া বিভিন্ন জরিপে নারীদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি নিয়ে আশাব্যঞ্জক কথা জানানো হয়েছে। নির্বাচনে বিগত সময়ের মতো নারীদের অংশগ্রহণ ব্যাপকহারে থাকতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, ১৩ কোটি ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। বিগত নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, প্রচার-প্রচারণা ও কেন্দ্রে উপস্থিতির ক্ষেত্রে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এবার সেই আগ্রহ আরো বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নারী ভোটারদের এই উদ্দীপনা ভোটের দিনে বজায় থাকলে তা মোট শতাংশে বড় প্রভাব ফেলবে। অতীতের নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোটদানের হার ছিল ৮৭.১৩%। আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে সর্বনিম্ন ৩৯.৫৮% ভোট পড়ে। তবে বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ভোটের হার বেশি দেখালেও সে সময় পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছিলেন ভোট পড়েছে মাত্র ৫-১০ শতাংশ।

প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন লাভ করে, যার মধ্যে ১১ জন্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে। মোট ভোট সংগৃহীত হয়েছিল ৫৪.৯%।

দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি জয়লাভ করে। তারা জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন লাভ করে। মোট ভোট সংগৃহীত হয়েছিল ৫১.৩%।

তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসন নিয়ে জয়লাভ করে। নির্বাচনে ৬১.১% ভোট সংগৃহীত হয়েছিল।

চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনটি বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রধান দলই বর্জন করেছিল। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি জয়লাভ করে, তারা ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৫১টি আসন লাভ করে। নির্বাচনে ৫২.৫% ভোট গৃহীত হয়েছিল।

পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপি জয়লাভ করে। তারা ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪২টি আসন লাভ করে। নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৫৫.৪%।

ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল নির্বাচনটি বর্জন করেছিল। মোট ভোট পড়েছিল মাত্র ২১%। এতে বিএনপি ৩০০টি আসনের মধ্যে ৩০০টি আসনই লাভ করে।

সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে। এ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৭৫.৬০%।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচন বিএনপি জয়লাভ করে। এতে ভোট পড়ে ৭৪.৯৭%।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয় লাভ করে। ভোটদানের হার ছিল ৮৭.১৩%।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ দলই এ নির্বাচন বর্জন করে। ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়। মোট ২৩৪টি আসন পায় আওয়ামী লীগ। ভোটদানের হার ৩৯.৫৮%।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৭টি আসন লাভ করে বিজয় অর্জন করে। ভোটদানের হার ছিল ৮০.২%।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি অংশ নেয়। এ নির্বাচনকে আমি আর ডামির নির্বাচন বলা হয়। নির্বাচনে ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। নির্বাচনে ২৯৮টি আসনের বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী ২২৩টি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হয়। জাতীয় পার্টি জয় পায় ১১টি আসনে। ৬১টি আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেন।